১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। বোলোনিয়ার সান মামোলো এলাকার এক কিশোর প্রতিদিন স্থানীয় ক্লাবে বাস্কেটবল খেলত, গালভানি ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করত, জিম করত, ট্যানিং সেশনে যেত এবং পাড়ার বিভিন্ন আড্ডায় মেতে থাকত। সেই সাধারণ কিশোরটিই আজ ইতালির সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।
তাঁর নাম আন্দ্রেয়া পিনিয়াতারো। ১৯৭০ সালে বোলোনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী এই উদ্যোক্তার মোট সম্পদের পরিমাণ এখন ৪২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার – এমনটাই জানাচ্ছে বিশ্বখ্যাত ধনীর তালিকা প্রণয়নকারী সংস্থা ফোর্বস। আর এই পরিসংখ্যানই তাঁকে বসিয়েছে ইতালির সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির আসনে। তিনি পেছনে ফেলেছেন চকোলেট সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী জিওভান্নি ফেরেরোকে, যাঁর সম্পদের চেয়ে পিনিয়াতারো এখন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার এগিয়ে।
চার বছরের রাজত্বের অবসান
টানা চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ফেরেরো ইতালির সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির শীর্ষস্থানে ছিলেন, কোনো প্রতিযোগীর কাছে পরাজিত না হয়েই। তাঁর আগে সর্বশেষ এই মুকুট ছিনিয়ে নিয়েছিলেন লুক্সোটিকার প্রতিষ্ঠাতা লিওনার্দো দেল ভেচ্চিও – তবে তা ছিল স্বল্পকালীন। এবার সেই শীর্ষস্থানে উঠে এলেন এমন একজন মানুষ, যিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত।
সাঁ মরিৎসে বাসস্থান, ব্যক্তিগত বিমান এবং বিশ্বজুড়ে অসংখ্য সম্পত্তির মালিক পিনিয়াতারো প্রচারবিমুখতায় রীতিমতো কিংবদন্তি। প্রকাশ্যে তাঁর ছবি পাওয়া দুষ্কর, সাক্ষাৎকার প্রায় নেই বললেই চলে, আর তাঁর কোম্পানিগুলো সম্পর্কে তথ্যও রাখা হয় সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
ক্যারিবিয়ান দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইনসে তিনি প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে কিনে নিয়েছেন ‘ক্যানুয়ান এস্টেট’ – ১,২৮০ একর বিস্তৃত একটি বিলাসবহুল সম্পত্তি, যেখানে রয়েছে হোটেল এবং একাধিক ভিলা।
পিনিয়াতারোর সাম্রাজ্যের ভিত্তি হলো ‘আয়ন গ্রুপ’ (Ion Group) – ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ব্রিটিশ ফিনটেক কোম্পানি,
ফোর্বস এর তথ্য অনুযায়ী
কীভাবে গড়ে উঠল এই বিশাল সাম্রাজ্য?
পিনিয়াতারোর সাম্রাজ্যের ভিত্তি হলো ‘আয়ন গ্রুপ’ (Ion Group) – ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি ব্রিটিশ ফিনটেক কোম্পানি, যা আর্থিক প্রযুক্তি, সফটওয়্যার ও ডেটা পরিষেবার ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
কোম্পানিটি বিশ্বের ৩০ শতাংশেরও বেশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিভিন্ন দেশের সরকার এবং আমাজন, মাইক্রোসফট ও প্রক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বলের মতো বৈশ্বিক কর্পোরেট জায়ান্টদের সেবা দিয়ে থাকে। আয়ন গ্রুপের নিজস্ব ভাষায়, তারা “আর্থিক প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার ও কোম্পানিগুলোকে অটোমেশন সফটওয়্যার, উচ্চমানের বিশ্লেষণ ও কৌশলগত পরামর্শ প্রদান করে, যা জটিল প্রক্রিয়াকে সহজ করে, দক্ষতা বাড়ায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও উন্নত করে।”
পুরো সাম্রাজ্যটি নিয়ন্ত্রিত হয় ‘বেসেল’ নামের একটি হোল্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে, যার সদর দপ্তর লুক্সেমবার্গে। বেসেলের অধীনে রয়েছে আরেকটি লুক্সেমবার্গ-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আইটিটি’, যেটি সরাসরি আয়ন গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে।

ইতালিতে বিনিয়োগের জোয়ার
প্রচারবিমুখ এই উদ্যোক্তা গত কয়েক বছরে ইতালিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিনি ইতালিতে বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন ইউরো। এই বিনিয়োগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বাণিজ্যিক তথ্য সংস্থা ‘চেরভেদ’ এবং ব্যাংকিং খাতে আইটি সেবাদাতা ‘চেদাক্রি’ অধিগ্রহণ।
এ ছাড়া তিনি মন্তে দেই পাস্কি দি সিয়েনা (এমপিএস) এবং করাদো পাসেরার ‘ব্যাংকা ইলিমিটি’র শেয়ারহোল্ডার হয়েছেন এবং কাসা দি রিস্পারমিও দি ভোলতেরার অংশীদার হয়েছেন। ২০২৪ সালে তিনি ১.৩৫ বিলিয়ন ইউরোয় কিনে নেন ‘প্রেলিওস’ — পিরেলি রিয়েল এস্টেটের উত্তরাধিকারী প্রতিষ্ঠান, যা সম্পত্তি সেবার পাশাপাশি এখন ‘নন-পারফর্মিং লোন’ বা খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সক্রিয়।
উল্লেখযোগ্য একটি তথ্য হলো, ২০২৫ সালের জুনে ইতালির কর কর্তৃপক্ষের সাথে একটি দীর্ঘ বিরোধের নিষ্পত্তি করেন পিনিয়াতারো, যেখানে তিনি ২৮০ মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ করেন। মূল দাবি ছিল ১.২ বিলিয়ন ইউরো। তবে তিনি কোনো দায়ভার স্বীকার করেননি।
সংখ্যার জাদুকর: একজন মেধাবী উদ্যোক্তার উত্থান
পিনিয়াতারোর জীবনের গল্পটি বোলোনিয়ার সাধারণ এক পরিবার থেকে শুরু। বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী ‘আলমা মাতের’ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক শেষ করে ১৯৯০-এর দশকে তিনি লন্ডনের পথ ধরেন – ঠিক তাঁর প্রজন্মের অনেক মেধাবী তরুণের মতোই। সেখানে ইম্পেরিয়াল কলেজে গণিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
১৯৯৪ সালে তিনি যোগ দেন মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক সালোমন ব্রাদার্সে, ট্রেডার হিসেবে – সেই সময়কার অন্যতম প্রভাবশালী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যা পরবর্তীতে সিটিগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত হয়। তাঁর বিশেষ পারদর্শিতা ছিল বন্ড মার্কেটে, বিশেষত ইতালির সরকারি ঋণপত্রের বাজারে।
তাঁর অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও সংখ্যার প্রতি তীক্ষ্ণ অনুভূতি নিয়ে সহকর্মীরা প্রায়ই বিস্মিত হতেন। কথিত আছে, বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ফ্রান্চেস্কো জিয়াভাৎসিও একবার পরীক্ষার সময় তাঁর স্মৃতিশক্তি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন।
অ্যালগরিদম-নির্ভর কোম্পানির স্বপ্ন
ট্রেডার হিসেবে কাজ করতে করতে পিনিয়াতারো অনুভব করলেন, ভবিষ্যতের আর্থিক বাজার হবে প্রযুক্তি ও তথ্যনির্ভর। এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নিল তাঁর দীর্ঘমেয়াদি স্বপ্ন – একটি ‘অ্যালগো-কোম্পানি’ গড়ে তোলা, অর্থাৎ এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার ভিত্তি হবে অ্যালগরিদম এবং ডেটা।
ইতালিয়ান আর্থিক দৈনিক ‘ইল সোলে ২৪ ওরে’কে দেওয়া বিরল একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ইতালির রয়েছে অসাধারণ সব স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়। ব্যক্তিগতভাবে, বোলোনিয়ায় আমি এমন শিক্ষকদের পেয়েছিলাম – মাধ্যমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত – যারা আমার জীবন বদলে দিয়েছেন। দেশটিকে অবশ্যই শিক্ষার মান বজায় রাখতে হবে এবং আরও উন্নত করতে হবে। মৌলিক গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের মধ্যে সহযোগিতামূলক গবেষণা এবং ক্রমবর্ধমান সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য বৃত্তি সহায়তায় বেসরকারি অর্থায়নকে উৎসাহিত করতে হবে।”
ব্যক্তিগত জীবন: খেলাধুলা ও বন্ধুত্বের জগৎ
ব্যক্তিগত জীবনেও পিনিয়াতারো ইতালির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। তিনি ইতালিতে ব্যক্তিগতভাবে অসংখ্য সম্পত্তির মালিক। সবচেয়ে আগ্রহজনক তথ্যটি হলো, তিনি ইতালির বিখ্যাত স্পোর্টসওয়্যার ব্র্যান্ড ‘ম্যাক্রন’-এর সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারের মালিক – যে কোম্পানিটি বোলোনিয়া ফুটবল ক্লাবের কিট স্পনসর হিসেবে পরিচিত।
ম্যাক্রনের প্রধান নির্বাহী জিয়ানলুকা পাভানেলো তাঁর অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সেই ছেলেটি, যে একসময় বোলোনিয়ার পাড়ায় বাস্কেটবল খেলত, আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তাদের একজন – শুধু নিজের ক্ষমতায়, নিজের মেধায় এবং অটুট প্রচারবিমুখতায়।

