ইউরোপের অধিকাংশ দেশ যখন অভিবাসন নীতিতে ক্রমশ কঠোরতার পথে হাঁটছে, ঠিক সেই সময়ে ব্যতিক্রমী এক সিদ্ধান্ত নিল স্পেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের নেতৃত্বাধীন সরকার ঘোষণা দিয়েছে, অনিয়মিতভাবে বসবাসরত কমপক্ষে পাঁচ লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়া হবে। দুই দশরেরও বেশি সময় পর নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে – দেশে এবং দেশের বাইরেও।
স্পেনে বসবাসরত বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু অনিয়মিত অভিবাসীর কাছে এই ঘোষণা এক নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে। তবে এই প্রক্রিয়াকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একের পর এক বিভ্রান্তিকর তথ্য, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তি: সত্য কতটুকু?
স্প্যানিশ সরকারের ঘোষণার পর থেকেই মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) নানা ধরনের মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছড়ানো দাবিটি হলো – বৈধতা পেলেই এই অভিবাসীরা স্পেনের জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন।
একটি পোস্ট তিন হাজারেরও বেশি বার শেয়ার হয়েছে, যেখানে দাবি করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সানচেজ ইচ্ছাকৃতভাবে ২০২৭ সালের নির্বাচনে ভোটের হিসাব মেলাতে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। আরেকটি পোস্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, “নির্বাচনের এক বছরেরও কম সময় আগে পাঁচ লাখ অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়া কি নির্বাচনি জালিয়াতি নয়?”
তবে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমগুলো ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে — এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র বৈধ বসবাসের অনুমতি পেলেই কেউ ভোটাধিকার পান না। ভোটাধিকারের জন্য স্পেনের নাগরিকত্ব অপরিহার্য।
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে থেকে যারা স্পেনে বসবাস করছেন
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী
নিয়মিত হওয়ার আবেদন করার সময় কমপক্ষে টানা পাঁচ মাস ধরে স্পেনে বসবাস করছেন এমন প্রমাণ যারা দেখাতে পারবেন
কারা আবেদন করতে পারবেন?
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হলে একজন আবেদনকারীকে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে।
প্রথমত, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে থেকে তাকে স্পেনে বসবাস করতে হবে এবং আবেদনের সময় কমপক্ষে টানা পাঁচ মাস ধরে দেশটিতে থাকার প্রমাণ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবেদনকারীর কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড থাকা চলবে না এবং তিনি জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারবেন না। তৃতীয়ত, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে যারা আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, তারাও এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারবেন।
সরকারি ডিক্রি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত আবেদন গ্রহণের সুযোগ থাকবে।

বৈধতা পেলে কী কী সুবিধা মিলবে?
এক বছর মেয়াদি বসবাসের অনুমতি: আবেদন অনুমোদিত হলে প্রাথমিকভাবে একজন আবেদনকারী এক বছর মেয়াদি রেসিডেন্স পারমিট পাবেন। এটি স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নয় – বরং এটি একটি আইনি সূচনাবিন্দু, যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে স্প্যানিশ অভিবাসন আইনের প্রচলিত পথে পারমিট নবায়ন করা যাবে।
কর্মসংস্থানের আইনি অধিকার: বৈধতা প্রাপ্তির পর একজন অভিবাসী স্পেনের যেকোনো প্রান্তে, যেকোনো খাতে আইনিভাবে কাজ করতে পারবেন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হওয়ার পর থেকেই – চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই – আবেদনকারীরা বৈধভাবে কাজ শুরু করতে পারবেন। এর মধ্য দিয়ে অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ শ্রমবাজার থেকে বেরিয়ে আসার এবং আনুষ্ঠানিক চুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের দাবি, এতে শ্রম শোষণ হ্রাস পাবে এবং শ্রমিক ও নিয়োগকর্তা উভয়ের জন্যই আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।
পারিবারিক পুনর্মিলন: যেসব অভিবাসীর অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তান স্পেনে রয়েছে, তাদের জন্যও এই প্রক্রিয়া সুযোগ নিয়ে এসেছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক অনিয়মিত অভিবাসীরা পাঁচ বছর মেয়াদি বসবাসের অনুমতি পেতে পারেন, যা গোটা পরিবারের আইনি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে।
সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি: বৈধভাবে কর্মরত একজন অভিবাসী স্পেনের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এর মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিক শ্রম অধিকারের সুরক্ষা পাবেন, পেনশন তহবিলে অবদান রাখতে পারবেন এবং কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। সরকার এই পুরো প্রক্রিয়াকে অভিবাসীদের স্প্যানিশ আইনি ও সামাজিক কাঠামোয় ‘অন্তর্ভুক্তি’র একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে।

যা পাওয়া যাবে না: ভুল ধারণার অবসান
স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব নয়: বৈধতা প্রাপ্তি এবং নাগরিকত্ব অর্জন — এ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সাধারণত ১০ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর একজন অভিবাসী নাগরিকত্বের আবেদন করতে পারেন। তবে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে এই সময়সীমা কম। ইবেরো-আমেরিকান দেশ, ফিলিপিন্স, পর্তুগাল ও আন্ডোরার নাগরিকদের জন্য মাত্র দুই বছরেই এই সুযোগ রয়েছে। স্বীকৃত শরণার্থীরা পাঁচ বছর পর আবেদন করতে পারেন। তবে নিয়মিত হওয়ার পর থেকেই বৈধ বসবাসের সময় গণনা শুরু হয়, যা নাগরিকত্বের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ভোটাধিকার মেলে না: সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো দাবির বিপরীতে বাস্তবতা হলো, বৈধতা প্রাপ্তির পরও একজন অভিবাসী জাতীয় বা আঞ্চলিক নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। এই অধিকার কেবলমাত্র স্পেনের নাগরিকত্ব অর্জনের পরই প্রযোজ্য। পৌরসভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে কিছু বিদেশি নাগরিক — বিশেষত ইইউর সদস্য রাষ্ট্রের নাগরিক এবং যাদের সাথে স্পেনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে — ভোট দিতে পারেন, তবে তার জন্যও বৈধ বসবাস ও ভোটার তালিকায় নিবন্ধনসহ বেশ কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হয়।
যা এখনো অস্পষ্ট
সরকার ঘোষণা দিলেও সংশ্লিষ্ট আইন চূড়ান্তভাবে প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর হবে না। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো পরিষ্কার নয়। আবেদনের সঠিক পদ্ধতি — অর্থাৎ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সরাসরি অফিস, না অ্যাপয়েন্টমেন্টের মাধ্যমে হবে — তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য নেই। পাঁচ মাস বা তার বেশি সময় স্পেনে অবস্থানের প্রমাণ হিসেবে কোন কোন নথি গ্রহণযোগ্য হবে, তা-ও স্পষ্ট করা হয়নি। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রদেশে আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা ও সময়সীমা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তাই যারা আবেদনের কথা ভাবছেন, তাদের জন্য আগামী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পেন সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও নির্দেশিকার প্রতি কড়া নজর রাখাই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
২০০৫-এর অভিজ্ঞতা কী বলে?
স্পেনে সর্বশেষ এ ধরনের বৃহৎ পরিসরে নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল ২০০৫ সালে, যখন পাঁচ লাখ ৭৬ হাজারেরও বেশি অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। তখনও সমালোচকেরা সতর্ক করেছিলেন যে এই সিদ্ধান্তের ফলে অনিয়মিত অভিবাসনের ঢল নামবে। তবে পরবর্তী গবেষণাগুলো সে আশঙ্কার পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ খুঁজে পায়নি।
বরং সেই অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, নিয়মিতকরণের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছিল মূলত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। প্রতিটি নিয়মিত অভিবাসীর মাধ্যমে স্পেন সরকার বছরে মাথাপিছু চার হাজার ইউরোরও বেশি রাজস্ব আয় করেছিল। হাজার হাজার কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাত থেকে বৈধ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেছিলেন, ফলে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তাদের অবদান বেড়েছিল এবং শ্রম শোষণ কমেছিল।
তবে গবেষণা এটাও দেখিয়েছে যে শ্রম শোষণ কমলেও বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি। স্থানীয় শ্রমিকদের তুলনায় অভিবাসীরা এখনো তুলনামূলকভাবে কম মজুরি পাচ্ছেন।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য কী?
সরকার স্পষ্ট করে বলছে, এটি একটি বাস্তবসম্মত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কারণ হাজার হাজার মানুষ বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই স্পেনে বসবাস করছেন এবং এমন সব খাতে কাজ করছেন, যেগুলো অভিবাসী কর্মীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
তবে ২০২৬ সালের স্পেন ২০০৫ সালের স্পেন থেকে অনেকটাই আলাদা। দেশটি এখন বেশ কিছু জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি — তীব্র বাসস্থান সংকট, পরিবর্তিত শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি এবং অভিবাসন ইস্যুতে গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণ।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, এই পদক্ষেপের সাফল্য কেবল আইনি ডিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, শ্রম আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন নীতিই নির্ধারণ করবে এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ।

