দালালের প্রলোভনে জীবনহানি এড়াতে এবং বৈধ অভিবাসন নিশ্চিত করতে শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরে যৌথ সচেতনতামূলক কর্মশালা করবে সরকার ও ইতালি দূতাবাস।
ইতালিতে দালালের খপ্পরে পড়ে বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা রুখতে এবং বৈধ উপায়ে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অন্তত ১০ হাজার বৈধ শ্রমিকের ইতালিতে কর্মসংস্থানের সুনির্দিষ্ট সুযোগ রয়েছে, যা কর্মী পরিবারের সদস্যদের হিসাব করলে প্রায় ১২ হাজারে পৌঁছাবে। সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই তথ্য জানানো হয়।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তনিও আলেসান্দ্রো এক সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। এ সময় বৈঠকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. শহিদুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে আলোচনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ইতালিতে প্রায় আড়াই লাখ বাংলাদেশি নাগরিক বসবাস করছেন। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রবাসীদের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই শরীয়তপুর ও মাদারীপুর অঞ্চলের বাসিন্দা। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বৈধভাবে যাওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দালালের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া হয়ে বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। এভাবে সমুদ্রপথে পাড়ি জমাতে গিয়ে অনেকেই আটক, অমানবিক নির্যাতন এবং মর্মান্তিক মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছেন।
অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিবাসন ঠেকাতে বাংলাদেশ ও ইতালি যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার ঝুঁকি কমাতে আমরা শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুর অঞ্চলে স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যৌথ সচেতনতামূলক কর্মশালার আয়োজন করতে যাচ্ছি।” এসব কর্মশালায় মানুষকে অবৈধ পথের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি বৈধ উপায়ে ইতালি যাওয়ার সঠিক প্রক্রিয়াগুলো বিশদভাবে বুঝিয়ে বলা হবে।

বৈঠকে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদেশ গমনের বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, যারা দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হবে। তবে ইতালিতে বর্তমানে যারা অবৈধভাবে অবস্থান করছেন, তাদের বৈধকরণের বিষয়ে এই বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
অভিবাসন ছাড়াও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে বেশ কিছু নতুন ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়। রাষ্ট্রদূত আন্তনিও আলেসান্দ্রো জানান, ইতালি বাংলাদেশের স্থপতিদের জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দিয়েছে। এছাড়া তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইতালীয় ভাষা শেখার সুবিধার জন্য বাংলাদেশের একটি ইনস্টিটিউটে দক্ষ প্রশিক্ষক পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি। পাশাপাশি ইতালির মিলান শহর যৌথভাবে বাংলাদেশের খুলনা নগরীর সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, ইতালি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশ প্রতিবছর ইতালি থেকে প্রায় ২ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য আমদানি করে এবং বিপরীতে ১.৮ বিলিয়ন ইউরোর পণ্য রপ্তানি করে। এছাড়া বাংলাদেশের মোট অর্জিত রেমিট্যান্সের প্রায় ৫ শতাংশই আসে ইতালি থেকে।
অন্য এক প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। দেশটির হাইকমিশনারের কাছে ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার বিষয়ে সরকারিভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এই সময়োপযোগী উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে একদিকে যেমন মানবপাচারকারীদের খপ্পর থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পাবেন, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তি বৈধ উপায়ে বিদেশে পাঠিয়ে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বেগবান করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ইতালিতে অবৈধ সমুদ্রপথ এড়িয়ে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ, প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশির জন্য বৈধভাবে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
tbsnews


