শেনজেন মুক্ত চলাচল চুক্তি পুনর্বহালের মধ্য দিয়ে বিমান ও নৌবন্দরে আরোপিত নজরদারি স্থায়ীভাবে বন্ধে সম্মত হয়েছে ইতালি ও স্পেন। ফলে দীর্ঘ কূটনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে ইউরোপের এই দুই অংশীদার দেশ পারস্পরিক নিরাপত্তা ও তথ্য বিনিময়ের ওপর নতুন করে জোর দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ মুক্ত চলাচল ব্যবস্থা বা শেনজেন চুক্তির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে স্পেনের সঙ্গে কার্যকর থাকা সাময়িক সীমান্ত তল্লাশি স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইতালি সরকার। এর ফলে বিগত কয়েক মাস ধরে দেশ দুটির মধ্যে আকাশ ও সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী যাত্রীদের ওপর আরোপিত বিশেষ নজরদারির অবসান ঘটতে যাচ্ছে। গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কাউন্সিলের শীর্ষ বৈঠকের ফাঁকে দুই দেশের সরকারপ্রধানদের আলোচনার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে এই সমঝোতা চূড়ান্ত রূপ পায়।
ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসি এবং স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কার মধ্যকার এক জরুরি টেলিফোন আলাপে সীমান্ত কড়াকড়ি তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এর আগে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় কাউন্সিলের বৈঠকের অবসরে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজও এই তল্লাশি বন্ধের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করেছিলেন। সার্বিক পরিস্থিতি সতর্কভাবে পর্যালোচনার পর উভয় দেশের প্রশাসন একই ধরনের যৌথ বার্তায় নিশ্চিত করেছে যে, বর্তমানে চালু থাকা সাময়িক সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের মেয়াদ আর নতুন করে বাড়ানো হবে না।
সরাসরি তল্লাশি বন্ধ হলেও সীমান্ত সুরক্ষায় কোনো শৈথিল্য দেখানো হবে না বলে স্পষ্ট করেছে দুই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। শেনজেন অঞ্চলের অখণ্ড নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় মাদ্রিদ ও রোমের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আরও বৃদ্ধি করবে।

নজিরবিহীন এই কূটনৈতিক বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল গত জুলাই মাসে। উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত ছিটমহল সেউতায় (Ceuta) মরক্কো সীমান্ত ভেঙে একদিনে প্রায় ৭০ হাজারের বেশি অভিবাসী প্রবেশ করেন। এই বড় ধরনের অনুপ্রবেশের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইতালি সরকার দ্রুত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেয়। সেই সিদ্ধান্তের আলোকেই গত ১ আগস্ট থেকে স্পেনের বন্দর ও বিমানবন্দর দিয়ে ইতালিতে প্রবেশকারী যাত্রীদের ওপর কঠোর তল্লাশি চালু করা হয়। তৎকালীন সময়ে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল, শেনজেনভুক্ত অঞ্চলের বাইরের নাগরিকদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হুমকি প্রতিহত করতেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে ইতালির এই পদক্ষেপে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কারণ ইতালি ও স্পেনের মধ্যে সরাসরি কোনো স্থলসীমান্ত নেই; ফলে সমুদ্র এবং আকাশপথেই মূলত এই বিধিনিষেধ চাপানো হয়েছিল। এছাড়া সেউতা শহরটি ভৌগোলিক ও নীতিগতভাবে শেনজেন মুক্ত চলাচল অঞ্চলের আওতায় পড়ে না। ফলে ইতালির এমন একতরফা পদক্ষেপকে অযৌক্তিক বলে প্রত্যাখ্যান করে মাদ্রিদ। স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস ইতালির এই আচরণকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘লজ্জাজনক’ বলে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এর এক সপ্তাহের মাথায় ক্ষুব্ধ স্পেনও ইতালি থেকে আসা যাত্রীদের ওপর পাল্টা তল্লাশি শুরু করে।
কয়েক মাসের তীব্র টানাপোড়েন শেষে অবশেষে উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল সমঝোতার মাধ্যমে এই অচলাবস্থার শান্তিপূর্ণ সমাধান এলো। দুই দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের নেওয়া সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে খুব দ্রুত ধাপে ধাপে সব ধরনের দ্বিপাক্ষিক তল্লাশি তুলে নেওয়া হবে, যা ইতালি ও স্পেনের মধ্যে চলাচলকারী সাধারণ যাত্রী এবং প্রবাসীদের জন্য অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করবে।
ইতালি স্পেনের সঙ্গে সাময়িক সীমান্ত তল্লাশি স্থায়ীভাবে তুলে নিতে সম্মত হয়েছে; ফলে শেনজেনের অবাধ চলাচল পুনর্বহাল হবে এবং দুই দেশের কূটনৈতিক উত্তেজনাও কমার পথে। নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে এতে।
noticiasbangla


