মধ্য ভূমধ্যসাগরে পৃথক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে দুই অন্তঃসত্ত্বা নারী ও ৩৬ অপ্রাপ্তবয়স্কসহ শতাধিক অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করেছে ‘লাইফ সাপোর্ট’; উদ্ধারকারী জাহাজকে দূরবর্তী বন্দরে পাঠানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে সংস্থাটি।
আন্তর্জাতিক জলসীমায় দুটি পৃথক উদ্ধার অভিযান চালিয়ে বাংলাদেশিসহ মোট ১১৩ জন অনিয়মিত অভিবাসীকে নিরাপদে উদ্ধার করেছে ইতালীয় দাতব্য সংস্থা ‘ইমার্জেন্সি’ (EMERGENCY)। সংস্থাটির নিজস্ব অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী জাহাজ ‘লাইফ সাপোর্ট’ (Life Support) মাল্টা ও লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় বিপদে পড়া দুটি নৌকা থেকে তাঁদের উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে দুজন অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং অভিভাবকহীন ৩৬ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর রয়েছেন। অভিবাসীদের নিয়ে জাহাজটি বর্তমানে ইতালীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী দেশটির দূরবর্তী জেনোয়া (Genova) বন্দরের উদ্দেশে যাত্রা করছে।
উদ্ধারকারী দল সূত্রে জানা গেছে, প্রথম অভিযানটি পরিচালিত হয় মঙ্গলবার বিকেলে মাল্টার দায়িত্বপ্রাপ্ত অনুসন্ধান ও উদ্ধার এলাকার (SAR zone) আন্তর্জাতিক জলসীমায়। সেখানে একটি ভারসাম্যহীন ও একপাশে বিপজ্জনকভাবে কাত হয়ে পড়া কাঠের নৌকায় ৭৩ জন অভিবাসী ভাসছিলেন। বেসরকারি নজরদারি সংস্থা ‘অ্যালার্ম ফোন’ (Alarm Phone)-এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজটি ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রায় দেড় দিন ধরে সাগরে কোনো ধরনের লাইফ জ্যাকেট ছাড়া ভাসতে থাকা ক্লান্ত এই দলটির মধ্যে ২০ জন নৌকার নিচের ডেকে অত্যন্ত ঘিঞ্জি পরিবেশে অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীতে বুধবার ভোররাতে লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় দ্বিতীয় অভিযান চালিয়ে একটি ছোট রবারের ডিঙি থেকে আরও ৪০ জনকে উদ্ধার করা হয়। গভীর রাতের অন্ধকার ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দ্বিতীয় অভিযানটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

জাহাজটিতে আশ্রয় পাওয়া অভিবাসীদের বড় অংশই আফ্রিকা ও এশিয়ার সংঘাত, অস্থিতিশীলতা ও চরম অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশগুলোর বাসিন্দা। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও সোমালিয়া, ইরিট্রিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান, নাইজার ও জিবুতির নাগরিক রয়েছেন। অভিবাসীরা জানান, প্রথম নৌকার আরোহীরা গত সোমবার মধ্যরাতে লিবিয়ার গ্যাস্র গারাবুল্লি (Gasr Garabulli) উপকূল থেকে রওয়ানা হয়েছিলেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় দলের অভিবাসীরা যাত্রা শুরু করেছিলেন লিবিয়ার জাবিয়া (Zawiya) শহর থেকে। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় ক্লান্ত হলেও তাঁদের কারও শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক নয় বলে চিকিৎসা কর্মীরা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে উদ্ধারকৃতদের নিরাপদে নামিয়ে দেওয়ার জন্য ইতালি সরকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের দূরবর্তী জেনোয়া বন্দর নির্ধারণ করেছে। উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় ৬৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত এই বন্দরে পৌঁছাতে জাহাজটির প্রায় চার দিন সময় লাগবে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন লাইফ সাপোর্টের মিশন প্রধান জনাথন নানি লা তেরা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উদ্ধারকারী জাহাজগুলোকে মধ্য ভূমধ্যসাগর থেকে দূরে সরিয়ে রাখতেই পরিকল্পিতভাবে এমন দূরবর্তী বন্দর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, এর ফলে সাগরে যখন প্রাণহানি ও বেআইনি পুশব্যাকের ঘটনা ঘটছে, তখন উদ্ধারকারী জাহাজগুলো সংকটপূর্ণ এলাকা থেকে দূরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছে। তবে দীর্ঘ যাত্রাপথেও সাগরে অন্য কোনো বিপন্ন নৌকার সন্ধান পেলে দ্রুত সহায়তা দিতে জাহাজটি সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জানান।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে মধ্য ভূমধ্যসাগরে সক্রিয় ‘লাইফ সাপোর্ট’ জাহাজের এটি ৪৬তম উদ্ধার অভিযান। এ পর্যন্ত জাহাজটি সমুদ্রের ঝুঁকিপূর্ণ পথ থেকে মোট ৩ হাজার ৭০১ জন মানুষকে নিরাপদে উদ্ধার করেছে। উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া উপকূল হয়ে সাগরপথে ইতালি পাড়ি দেওয়ার এই বিপজ্জনক রুটে প্রায়শই বহু বাংলাদেশি নাগরিকের উপস্থিতি দেখা যায়।
ইমার্জেন্সির লাইফ সাপোর্ট ভূমধ্যসাগরে দুটি অভিযানে ১১৩ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে, যাঁদের মধ্যে ৩৬ জন সঙ্গীহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক ও দুইজন অন্তঃসত্ত্বা নারী রয়েছেন। জাহাজটির গন্তব্য জেনোয়া, উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় ৬৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে।
repubblica


