ইতালির কাসালোত্তিতে সংঘটিত ট্রিপল মার্ডারের প্রধান সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেন ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে ইতালি ত্যাগ করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা; একমাত্র জীবিত সাক্ষী আমিরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ।
ইতালির রাজধানী রোমের কাসালোত্তি (Casalotti) এলাকায় একই পরিবারের তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারেনি স্থানীয় পুলিশ। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ধারণা, ৪৩ বছর বয়সী সন্দেহভাজন ঘাতক শাহাদাত হোসেন (Sadat Hussein) ইতিমধ্যে ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে এবং কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের সহায়তায় ইতালি সীমান্ত পার হয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এই আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক পর্যায়সহ সম্ভাব্য সব রুটে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
তদন্তের গতিপ্রকৃতি ও সম্ভাব্য রুট
রোম পুলিশের বিশেষ অপরাধ তদন্ত বিভাগ ‘স্কোয়াড্রা মোবাইল’ (Squadra Mobile) এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে কাজ করছে। তদন্তকারীদের মতে, শাহাদাত হোসেন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে আত্মগোপন করেছেন। বর্তমানে পুলিশ প্রধানত দুটি রুটকে সামনে রেখে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। প্রথমত, তিনি তার নিজ দেশ বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, ইতালিতে আসার আগে তিনি দীর্ঘকাল যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করায় সেখানে তার শক্ত নেটওয়ার্ক থাকতে পারে এবং সেখানেও তিনি আশ্রয় নিতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই রোমের সবকটি বিমানবন্দর ও রেলস্টেশনে অভিযুক্তের ছবি সংবলিত সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। তবে শাহাদাত কোনো স্থলপথ ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশে গিয়ে সেখান থেকে ভিন্ন নথিপত্র ব্যবহার করে বিমানে চড়ে থাকতে পারেন। তার পরিচিত মহলে এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের ওপরও কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে।
একমাত্র সাক্ষীর নিরাপত্তা ও আইনি পদক্ষেপ
এই ভয়াবহ হামলায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া পরিবারের বড় ছেলে ২০ বছর বয়সী আমির হোসেন (Amir Hossain) বর্তমানে এই মামলার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রধান সাক্ষী। শাহাদাত গ্রেফতার না হওয়ায় আমির হোসেনের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন তার আইনজীবী ফ্যাব্রিজিও গ্যালো (Fabrizio Gallo)।

আইনজীবী গ্যালো ইতিমধ্যে রোম প্রসিকিউটর অফিসের (Procura di Roma) কাছে আমিরের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন দাখিল করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ঘাতক মুক্ত থাকায় আমির হোসেন প্রতিনিয়ত মৃত্যুভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আমিরের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাকে যেন কঠোর পুলিশি পাহারায় রাখা হয়, সে বিষয়ে জোর দাবি জানানো হয়েছে।
মরদেহ সৎকার ও পরবর্তী প্রক্রিয়া
অন্যদিকে, নিহত তিন বাংলাদেশি- কামাল উদ্দিন (৫৫), তার স্ত্রী হোসনে জাহান (৪৮) এবং তাদের আট বছরের শিশু কন্যা আরোয়ার (Arwa) মরদেহগুলো এখনও ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার কারণে হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। আইনজীবী ফ্যাব্রিজিও গ্যালো নিহতদের মরদেহগুলো দ্রুত বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য প্রসিকিউটরের কাছে ছাড়পত্রের আবেদন করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, যেন ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী নিজ দেশে তাদের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও মোটিভ
গত ২৫ জুন দিবাগত রাতে রোমের ভিয়া মন্তিগ্লিওর (Via Montiglio) একটি ফ্ল্যাটে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তদন্তকারীদের মতে, অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন একটি বড় চাপাতি বা মাংস কাটার ছুরি (Mannaia) দিয়ে ঘুমন্ত পরিবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিহত হোসনে জাহানের প্রতি শাহাদাতের কথিত ‘আচ্ছন্নতা’ বা একতরফা ব্যক্তিগত রেষারেষি থেকে এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হতে পারে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। আমির হোসেন তার বাবা-মা ও বোনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেও গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
বর্তমানে রোম প্রসিকিউটর অফিস এবং আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। শাহাদাত হোসেন যদি ইতালির বাইরে গিয়ে থাকেন, তবে তাকে ইন্টারপোলের (Interpol) মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। ইতালির প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এই নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে। আমিরের সাক্ষ্য এবং শাহাদাতের গ্রেফতারই এখন এই মামলার চূড়ান্ত মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

কাসালোত্তি হত্যাকাণ্ড: জানা গেছে, হত্যাকারী বিদেশে পালিয়ে গেছে। একমাত্র জীবিত ব্যক্তির জীবন এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে।
romatoday
জানা গেছে, তিনজনকে হত্যার পরপরই শাহাদাত হোসেন ইতালি ছেড়ে চলে যান। একমাত্র জীবিত ছেলেটির আইনজীবী তার জন্য সুরক্ষা চেয়েছেন: “সে আতঙ্কের মধ্যে বাস করছে।”
কাসালোত্তিতে তিনজনকে হত্যার তিন সপ্তাহ পর শাহাদাত হোসেনকে খুঁজে বের করা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। গত ২৫ জুন কুড়াল দিয়ে কামাল উদ্দিন, হোসনে জাহাল ও ছোট্ট আরোয়াকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ৪৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ। রোম ফ্লাইং স্কোয়াডের তদন্ত এখন একটি সম্ভাব্য পরিকল্পিত পলায়নের দিকে মনোনিবেশ করছে, যার সঙ্গে একদল সমর্থক জড়িত থাকতে পারে ।
বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার অনুমান
তদন্তকারীরা দুটি প্রধান সূত্র ধরে এগোচ্ছেন। প্রথম সূত্রটি হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত অপরাধীর উৎস দেশ বাংলাদেশের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পরিচালিত তদন্ত এ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তদন্তকারীরা বর্তমানে দ্বিতীয় যে অনুমানটি খতিয়ে দেখছেন, তা লন্ডনের দিকে নির্দেশ করে; রাজধানীতে আসার আগে ওই ব্যক্তি সেখানেই বসবাস করতেন।
সন্দেহ করা হচ্ছে যে, হোসেন একা এই কাজ করেননি। ঘটনার পরিস্থিতি এবং ৪৩ বছর বয়সী ব্যক্তিটির দ্রুত নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বাড়িতে হামলার আগেই ওঁৎ পেতে থাকা হয়েছিল এবং পালানোর পথও আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, পলাতক ব্যক্তিটি হয়তো জাল কাগজপত্র ব্যবহার করেছিলেন এবং রোমে এখনও উপস্থিত থাকা এক বা একাধিক সহযোগী তাকে ইতালি ছাড়তে সাহায্য করেছিল।
বেঁচে থাকা ব্যক্তির আবেদন
এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন আমির হোসেনের অবস্থা , যিনি এই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত ব্যক্তি এবং একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তাঁর আইনজীবী, ফ্যাব্রিজিও গ্যালো, নিত্যসঙ্গী এই যুবকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে সুরক্ষার আবেদন করেছেন।
“আমি তদন্তকারীদের তার সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে বলেছি,” আইনজীবী গ্যালো ব্যাখ্যা করেন। “এই যুবক আজকাল চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। আমরা মরদেহগুলো হস্তান্তরের জন্য প্রসিকিউটর অফিসের কাছে অনুমতিও চেয়েছি, যাতে আমির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য সেগুলো বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে পারে।” হামলার পর্যায়গুলো সঠিকভাবে পুনর্গঠন করতে এবং হত্যাকারীর পালাতে সাহায্যকারী কোনো বহিরাগতকে শনাক্ত করার জন্য আমির হোসেনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

