ইউরোপীয় ইউনিয়নের শ্রমবাজারে স্থায়ী কর্মসংস্থানে পিছিয়ে অ-ইউরোপীয় অভিবাসীরা: ইউরোস্ট্যাটের প্রতিবেদন

4 Min Read

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থেকে আসা অভিবাসীরা স্থানীয়দের তুলনায় অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন চাকরিতে বেশি নিযুক্ত থাকছেন এবং উচ্চ শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই যোগ্যতার চেয়ে নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

ব্রাসেলস, বেলজিয়াম

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলোতে স্থানীয় নাগরিকদের তুলনায় ইইউ বহির্ভূত দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এখনো বড় ধরনের কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ইইউর পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাট (Eurostat)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, অ-ইউরোপীয় অভিবাসীরা মূলত অস্থায়ী চুক্তিভিত্তিক এবং খণ্ডকালীন চাকরিতেই বেশি নিয়োজিত থাকছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব এবং অভিবাসন মর্যাদা এখনো ইউরোপের শ্রমবাজারে একজন ব্যক্তির সফল হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

ইউরোস্ট্যাটের ‘শ্রমশক্তি বিষয়ক জরিপ’-এ ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০ থেকে ৬৪ বছর বয়সী অ-ইউরোপীয় অভিবাসীদের মধ্যে অস্থায়ী চাকরির হার সবচেয়ে বেশি। গবেষণার শেষ পর্যায়ে দেখা যায়, অ-ইউরোপীয় নাগরিকদের প্রায় ২২ শতাংশ অস্থায়ী চুক্তিতে কাজ করছেন। এর বিপরীতে ইউরোপের অন্য দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই হার ১২ শতাংশ এবং স্থানীয় নাগরিকদের ক্ষেত্রে মাত্র ১১ শতাংশ। অর্থাৎ, স্থানীয়দের তুলনায় অভিবাসীরা দ্বিগুণ হারে অনিশ্চিত কর্মসংস্থানে যুক্ত রয়েছেন।

গবেষণায় কর্মসংস্থানকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—স্ব-নিযুক্ত বা ব্যবসা, অস্থায়ী চাকরি এবং খণ্ডকালীন চাকরি। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অভিবাসীদের মধ্যে নিজের ব্যবসা বা স্ব-নিযুক্ত হওয়ার প্রবণতা স্থানীয়দের তুলনায় অনেক কম। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তির অভাব এবং প্রয়োজনীয় পুঁজি সংগ্রহের ক্ষেত্রে নানা প্রশাসনিক বাধার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীরা স্বেচ্ছায় বা পরিস্থিতির চাপে খণ্ডকালীন কাজ বেছে নেন। কেউ কেউ মৌসুমি কাজ করতে পছন্দ করেন যাতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নিজ দেশে পরিবারের কাছে ফিরে যেতে পারেন। আবার অনেকে নমনীয় কর্মঘণ্টার জন্য খণ্ডকালীন কাজ বেছে নিলেও বড় একটি অংশ স্থায়ী কাজের অভাবে এমন অনিশ্চিত পেশায় থাকতে বাধ্য হন।

এদিকে, ৩৮টি উন্নত দেশের সংগঠন ওইসিডি (OECD)-এর এক প্রতিবেদনে কর্মসংস্থানকে সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রধান সূচক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে অভিবাসীদের কর্মদক্ষতা বাড়লেও স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের ব্যবধান এখনো ঘুচেনি। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষিত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ‘ওভার-কোয়ালিফিকেশন’ বা যোগ্যতার অবমূল্যায়ন একটি বড় সমস্যা। দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষিত ৪৭ শতাংশ অভিবাসী তাদের যোগ্যতার চেয়ে অনেক নিচু মানের কাজ করছেন অথবা বেকার রয়েছেন, যেখানে স্থানীয়দের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩০ শতাংশ। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, যদি কোনো অভিবাসী যে দেশে বসবাস করছেন সেই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জন করেন, তবে স্থানীয়দের সঙ্গে তাদের যোগ্যতার ব্যবধান প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে।

শ্রমবাজারের এই বৈষম্যে লৈঙ্গিক পরিচয়ও একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, অভিবাসী নারীরা পুরুষদের তুলনায় কর্মক্ষেত্রে বেশি পিছিয়ে আছেন। পুরুষদের কর্মসংস্থানের হার ৮১ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ৭১ শতাংশ। বিশেষ করে ইতালি, স্পেন ও পর্তুগালে অভিবাসী নারীদের অস্থায়ী চাকরিতে যুক্ত থাকার হার অনেক বেশি। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে পারিবারিক দায়িত্ব পালন এবং শিশু বা বয়স্কদের দেখাশোনার বিষয়টিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া পেশাগত বিভাজনের কারণে অভিবাসী নারীরা মূলত স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং গৃহস্থালি কাজের মতো খাতগুলোতে বেশি যুক্ত থাকেন, যেখানে স্থায়ী চুক্তির সুযোগ কম থাকে।

সামগ্রিকভাবে, ইউরোপের শ্রমবাজারে অভিবাসীদের অংশগ্রহন বাড়লেও কাজের ধরন ও স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে এখনো অনেক পথ চলা বাকি। অস্থায়ী চাকরি শ্রমবাজারে প্রবেশের প্রাথমিক সুযোগ তৈরি করলেও এটি ভবিষ্যতে স্থায়ী ও নিরাপদ কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দিচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, অভিবাসীদের মেধা ও দক্ষতার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা না গেলে ইউরোপের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


ইইউর বাইরে থেকে আসা অভিবাসীরা স্থানীয়দের তুলনায় অস্থায়ী ও খণ্ডকালীন চাকরিতে বেশি নিয়োজিত; ভাষা, দক্ষতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা এখনও বড় বাধা।

infomigrants

TAGGED:
Share This Article