বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত করতে এবং প্রবাসীদের ব্যাংকিং ও সরকারি সেবা সহজলভ্য করার লক্ষ্যে এই বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার; প্রথম ধাপে অগ্রাধিকার পাবেন বিএমইটি নিবন্ধিত কর্মীরা।
ঢাকা, বাংলাদেশ
বিদেশে কর্মরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘প্রবাসী কার্ড’ বা এক্সপ্যাট্রিয়েট কার্ড চালু করার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। আগামী আগস্ট মাস থেকেই এই কার্ডের পরীক্ষামূলক বিতরণ কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। প্রবাসীদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং তাদের জন্য আর্থিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে অন্তত ২ লক্ষ প্রবাসী কর্মীর হাতে এই স্মার্ট কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে।
ডিজিটাল পরিচয় ও আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা
প্রস্তাবিত এই প্রবাসী কার্ডটি কেবল একটি পরিচয়পত্র নয়, বরং এটি একটি আধুনিক স্মার্ট ডিজিটাল টুল হিসেবে কাজ করবে। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে এটি ডেবিট কার্ড আকারে বিতরণ করা হবে। এই কার্ডে একটি বিশেষ কিউআর (QR) কোড থাকবে, যা স্ক্যান করার মাধ্যমে কার্ডধারীর যাবতীয় তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যাবে। এছাড়া প্লাস্টিক কার্ডের পাশাপাশি একটি ডেবিট কার্ড অ্যাপ বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এর ডিজিটাল সংস্করণ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। ফলে প্রবাসীদের সবসময় সশরীরে প্লাস্টিক কার্ড বহন করার ঝামেলা পোহাতে হবে না।
আর্থিক লেনদেনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ও কেনাকাটার সুবিধা
প্রবাসী কার্ডের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো এর ‘ডুয়েল কারেন্সি’ বা দ্বৈত মুদ্রা সুবিধা। এই কার্ডে আধুনিক পেমেন্ট গেটওয়ে যুক্ত থাকায় প্রবাসীরা বিদেশে অবস্থানকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রায় এবং বাংলাদেশে অবস্থানকালে টাকায় লেনদেন করতে পারবেন। এছাড়া প্রবাসে বসেই এই কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের জন্য দেশে নির্দিষ্ট সীমার কেনাকাটা বা অনলাইন শপিং করার সুযোগ থাকছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই সুবিধার ফলে হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

বিমানবন্দর ও আবাসন ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার
প্রবাসী কার্ডধারীরা দেশের বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষ প্রটোকল সেবা পাবেন। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ, উড়োজাহাজের টিকিট বুকিংয়ে ছাড় এবং নির্ধারিত হোটেলে ডিসকাউন্ট অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সমস্যা সমাধানে বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে ‘প্রবাসী সিটি’ বা হাউজিং প্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এসব প্রকল্পে প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কার্ডধারীরা অগ্রাধিকার এবং বিশেষ মূল্যছাড় পাবেন।
সামাজিক সুরক্ষা ও বীমা সুবিধা
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) অধীনে বর্তমানে প্রবাসীরা যেসব বীমা ও আর্থিক ক্ষতিপূরণ সুবিধা পান, তা এই কার্ডের মাধ্যমে আরও সহজতর হবে। দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা পঙ্গুত্বের ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার যাবতীয় বিষয়গুলো এই ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আসবে। এছাড়া রেমিট্যান্স পাঠানোর বিপরীতে সরকার যে অতিরিক্ত আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে থাকে, কার্ডধারীদের জন্য সেই সুবিধা পূর্বের মতোই বহাল থাকবে।
কারা পাবেন এবং কীভাবে সংগ্রহ করবেন?
প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল সেই সব প্রবাসীরা এই কার্ড পাবেন যাদের জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ডাটাবেজে সফলভাবে নিবন্ধন করা আছে। যাদের কাছে আগে থেকেই বিএমইটি কার্ড রয়েছে, তারা প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন। কর্মকর্তাদের মতে, পুরাতন নিবন্ধিতদের জন্য নতুন করে ফি দেওয়ার প্রয়োজন না হলেও নতুন আবেদনকারীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সরকারি ফি নির্ধারিত হতে পারে।
পরবর্তী পদক্ষেপ ও বৈশ্বিক সম্প্রসারণ
আগস্টের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফল হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোর মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এই কার্ড বিতরণ কার্যক্রম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে যারা শিক্ষার্থী বা নির্ভরশীল ভিসায় গিয়ে পরবর্তীতে কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন কিন্তু এখনো বিএমইটি নিবন্ধনের বাইরে রয়েছেন, তাদেরও এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আনার জন্য নীতিগত কাজ শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। এই উদ্যোগটি সফল হলে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জীবনযাত্রার মান এবং রাষ্ট্রীয় সেবাপ্রাপ্তি আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আগস্ট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘প্রবাসী কার্ড’; প্রথম ধাপে বিএমইটি নিবন্ধিত প্রবাসীরা অগ্রাধিকার পাবেন, যা ব্যাংকিং, সরকারি সেবা ও বৈধ রেমিট্যান্সে বিশেষ সুবিধা দেবে।
ittefaq


