বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ইতালি সরকারের সাম্প্রতিক কড়াকড়ি ও সীমাবদ্ধতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনি কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা যাচাই করতে বিষয়টি ইইউ-এর বিচার আদালতের কাছে পাঠিয়েছে ইতালির সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত।
রোম
ইতালির বংশসূত্রে নাগরিকত্ব বা ‘ইউরে সাঙ্গুইনিস’ (Jure Sanguinis) আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনী নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি মোড় তৈরি হয়েছে। ইতালির সাংবিধানিক আদালত (Corte costituzionale) তার ১৪৭ নম্বর অধ্যাদেশের মাধ্যমে ২০২৫ সালের নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নতুন ডিক্রির (DL 36/2025) বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উত্থাপিত মামলাটি ইউরোপীয় বিচার আদালতের (CJEU) কাছে পাঠিয়েছে। বিশেষ করে, নাগরিকত্বের ওপর যে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৌলিক আইন লঙ্ঘন করে কি না, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
ইতালির নাগরিকত্ব আইন ৯১/১৯৯২-এর নতুন সংযোজিত ৩-বিস (Article 3-bis) ধারা অনুযায়ী, অতীতে প্রচলিত বংশসূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার ‘অসীম’ অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। নতুন এই বিতর্কিত আইনে বলা হয়েছে, যারা ইতালির বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্ব রয়েছে, তারা জন্মগতভাবে ইতালীয় নাগরিক হিসেবে গণ্য হবেন না। তবে তিনটি নির্দিষ্ট শর্তের যেকোনো একটি পূরণ করলে তারা এই অধিকার ফিরে পেতে পারেন।
প্রথম শর্ত অনুযায়ী, আবেদনকারীকে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ রাত ১১টা ৫৯ মিনিটের মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য প্রশাসনিক বা বিচার বিভাগীয় আবেদন জমা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আবেদনকারীর বাবা-মা বা দাদা-দাদির অন্তত একজনকে মৃত্যুর সময় পর্যন্ত কেবল ইতালীয় নাগরিক হতে হবে (অর্থাৎ তারা অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিতে পারবেন না)। তৃতীয় শর্তটি হলো, আবেদনকারীর জন্মের আগে তার বাবা-মা বা দত্তক গ্রহণকারীকে ইতালিতে অন্তত একটানা দুই বছর বসবাস করতে হবে।

এই কঠোর বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ইতালির কাম্পোবাসো (Campobasso) এবং মানতোভা (Mantova) অঞ্চলের আদালতগুলো আপত্তি তুলেছে। কাম্পোবাসো আদালতের মতে, এই আইনটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তির (TUE) ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্যপ্রণালী সংক্রান্ত চুক্তির (TFUE) ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের সরাসরি লঙ্ঘন। ইইউ আইন অনুযায়ী, প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নাগরিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নেরও নাগরিক। ফলে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার মতো কোনো আইন করার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জীবনের ওপর এর প্রভাব এবং ‘আনুপাতিকতা নীতি’ (Principle of proportionality) যথাযথভাবে বিচার করা প্রয়োজন।
মামলার প্রেক্ষিতে সাংবিধানিক আদালত জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়ার একক ক্ষমতা রয়েছে সিজেএইউ (CGUE)-এর। যদিও ইতালির এই উচ্চ আদালত এর আগে এক রায়ে বলেছিল যে, ইইউ নাগরিকত্ব নিয়ে সিজেএইউ-এর আগের নজিরগুলো মূলত নাগরিকত্ব ‘কেড়ে নেওয়ার’ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আর বর্তমান বিতর্কিত ৩-বিস ধারাটি নাগরিকত্ব ‘অর্জনের প্রাথমিক বাধার’ সাথে সম্পর্কিত। তবে বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং ইইউ-এর সাথে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের স্বার্থে তারা চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য বিষয়টি লাক্সেমবার্গে অবস্থিত ইইউ আদালতের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই আইনি সিদ্ধান্তের ফলে হাজার হাজার আবেদনকারীর ভাগ্য এখন ইউরোপীয় আদালতের রায়ের ওপর ঝুলে রইল। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে বসবাসরত ইতালীয় বংশোদ্ভূতদের জন্য এই রায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদি ইইউ আদালত মনে করে যে ইতালির এই নতুন বিধিগুলো ইইউ নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে, তবে ইতালীয় সরকারকে এই আইনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হতে পারে। বর্তমানে আদালত এটিই খতিয়ে দেখবে যে, বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ‘প্রাথমিক বাধা’ আইনত গ্রহণযোগ্য কি না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের মতোই এখন সিজেএইউ-এর রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে ইতালির বিচার বিভাগ।
ইতালির বংশসূত্রে নাগরিকত্ব সীমিত করার নতুন আইন ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য ইতালির সাংবিধানিক আদালত বিষয়টি ইউরোপীয় আদালতে পাঠিয়েছে।
integrazionemigranti


