ইতালির দক্ষিণে দাবানলের তাণ্ডব: সমুদ্র সৈকত ও রিসোর্ট থেকে পর্যটকদের জরুরি স্থানান্তর

4 Min Read

দক্ষিণ ইতালির গার্গানো উপদ্বীপ এবং মোলিসে অঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ায় চরম সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত জনবসতি ও পর্যটন কেন্দ্রের দিকে ধাবিত হওয়ায় সমুদ্র সৈকত এবং ক্যাম্পিং সাইটগুলো থেকে শত শত মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ২০০৭ সালের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইতালির পর্যটন মৌসুমে বড় ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে।

উদ্ধার অভিযান ও বর্তমান পরিস্থিতি

পুডলিয়া (Puglia) অঞ্চলের গার্গানো উপকূলে আগুনের লেলিহান শিখা সৈকতের খুব কাছাকাছি চলে আসায় কয়েকশ পর্যটক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বিশেষ করে পেস্তিকি (Peschici) এলাকায় পরিস্থিতি সবথেকে ভয়াবহ রূপ নেয়। আগুনের কারণে স্থলপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় সমুদ্রপথে উদ্ধার অভিযান শুরু করে কোস্ট গার্ড বা কোস্টা চিলিয়া (Guardia Costiera) এবং ফিন্যান্স পুলিশ (Guardia di Finanza)। মোট ছয়টি নৌ-ইউনিট এবং বেসরকারি নৌকার সহায়তায় প্রায় ৪০০ পর্যটককে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

উদ্ধারকৃতদের মধ্যে প্রায় ১০০ জনকে সরাসরি সমুদ্রপথে ভিয়েস্তে (Vieste) বন্দরে নিয়ে আসা হয়। বাকিরা নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বিশেষ বাসে করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছান। ভিয়েস্তের মেয়র জুসেপ্পে নোবিলেত্তি জানিয়েছেন, সরিয়ে আনা পর্যটকদের আপাতত দুটি স্কুলের জিমনেসিয়ামে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা এবং খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। আগুনের তীব্রতা কিছুটা কমে আসায় অনেককে পুনরায় তাদের রিসোর্টে ফেরার অনুমতি দেওয়া হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

মোলিসে অঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি ও স্থানান্তর

দাবানলের প্রকোপ কেবল গার্গানোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, পার্শ্ববর্তী মোলিসে (Molise) অঞ্চলেও ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কাম্পোমারিনো (Campomarino) এলাকার একটি নার্সিং হোম থেকে ২১ জন প্রবীণ নাগরিককে জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় একটি চার্চে স্থানান্তর করা হয়েছে। এছাড়া উপকূলীয় একটি হোটেলের কাছে আগুন পৌঁছে গেলেও সংস্কার কাজের জন্য ভবনটি বন্ধ থাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণে ইতালির দক্ষিণ উপকূলে যাতায়াতকারী আদ্রিয়াটিক (Adriatica) রেললাইনের পেসকারা ও ফোজ্জা সেকশনে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রেললাইনের ওপর আগুনের শিখা চলে আসায় বহু ট্রেন বাতিল করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। এছাড়া ভিয়েস্তে-পেস্তিকি লিটোরাল রোডসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন।

নাশকতার সন্দেহ ও প্রশাসনিক বক্তব্য

পেস্তিকির মেয়র লুইজি ডি’আরেঞ্জো এই অগ্নিকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত নাশকতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বনের একাধিক স্থানে একসাথে আগুন লাগার ঘটনা প্রমাণ করে যে এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছে। গার্গানোর রেলওয়ে প্রধান ভিঞ্চেনজো স্কারচিয়া জার্মানও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গত ২০ বছর ধরে যে পাইন বনগুলো কষ্ট করে বেড়ে উঠেছিল, এই আগুন এক নিমেষে তা ধ্বংস করে দিচ্ছে।

অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে বর্তমানে অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর (Vigili del Fuoco) বিশাল একটি দল কাজ করছে। আকাশপথে জল ছিটানোর জন্য দুটি বিশেষ ‘কানাডায়ার’ (Canadair) বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। দেশটির ফোজ্জা প্রদেশের বংশোদ্ভূত ফাইভ স্টার মুভমেন্টের (M5s) নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কন্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর এবং এই বিপর্যয় মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন।

পেছনের স্মৃতি ও সম্ভাব্য প্রভাব

এই অগ্নিকাণ্ড ২০০৭ সালের সেই মর্মান্তিক স্মৃতিকে জাগিয়ে তুলেছে যখন একই এলাকায় দাবানলের আগুনে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদ নষ্ট হয়েছিল। বর্তমানে তীব্র দাবদাহ ও শক্তিশালী বাতাসের কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বনভূমি ও স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি গ্রীষ্মকালীন পর্যটন ব্যবসায় বড় ধরণের ধস নামার আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সিভিল প্রোটেকশন বা প্রোতেৎসিওনে চিভিলে (Protezione Civile) পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন কারা এই নাশকতার পেছনে জড়িত থাকতে পারে। আগামী কয়েকদিন আবহাওয়া শুষ্ক থাকলে আগুনের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে।

প্রবল বাতাসে ছড়িয়ে পড়া দাবানলে ইতালির গার্গানো ও মোলিসেতে সৈকত, ক্যাম্পিং ও রেলপথ খালি করা হয়েছে; শত শত পর্যটককে নৌকা ও উদ্ধার অভিযানে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ansa

TAGGED:
Share This Article