নেপলসের মহাসড়কে গাড়ি ছিনতাইয়ের জন্য অপরাধীরা অভিনব ও বিচিত্র সব কৌশল গ্রহণ করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাম্প্রতিক এক তথ্যে দেখা গেছে, চলন্ত গাড়িতে মরা ইঁদুর ছুড়ে দিয়ে চালককে আতঙ্কিত করার পর গাড়ি নিয়ে চম্পট দিচ্ছে দুষ্কৃতীরা।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর নেপলস (Napoli) তার ঐতিহাসিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের জন্য বিশ্ববিখ্যাত হলেও, অপরাধীদের বিচিত্র সব ফন্দি-ফিকিরের কারণে শহরটি প্রায়ই সংবাদপত্রের শিরোনামে আসে। সম্প্রতি নেপলসের মহাসড়কগুলোতে গাড়ি ছিনতাইয়ের এক অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও অদ্ভুত কৌশল সামনে এসেছে। অপরাধীরা এখন লক্ষ্যবস্তুর চলন্ত গাড়ির ভেতর মরা ইঁদুর ছুড়ে মারছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা চালকদের মধ্যে চরম ভীতির সঞ্চার করেছে।
‘মরা ইঁদুর’ এবং ছিনতাইয়ের অভিনব ছক
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটক (TikTok) এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ভুক্তভোগীদের দেওয়া বিভিন্ন ভিডিও থেকে জানা গেছে, নেপলসের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ‘আস-সে মেদিয়ানো’ (Asse Mediano)-তে এই অভিনব ডাকাতি সংঘটিত হচ্ছে। অপরাধীদের পরিকল্পনাটি বেশ সোজাসাপ্টা কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর। তারা সড়কের পাশে সুবিধাজনক স্থানে ওত পেতে থাকে এবং কোনো গাড়ির জানালা সামান্য খোলা দেখলেই ভেতরে একটি বড় আকারের মরা ইঁদুর ছুড়ে দেয়।
চলন্ত গাড়ির ভেতরে হঠাৎ একটি নোংরা ইঁদুর বা এ জাতীয় কিছু দেখে যে কোনো সাধারণ চালকই স্বাভাবিকভাবে চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চালক গাড়ি থামিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। চালক যখন আতঙ্ক সামলাতে বা গাড়ি থেকে ইঁদুরটি সরাতে ব্যস্ত থাকেন, ঠিক সেই সুযোগে ওত পেতে থাকা অন্য এক সহযোগী দ্রুত গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসে পড়ে এবং চোখের পলকে গাড়িটি নিয়ে উধাও হয়ে যায়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরণের প্রতিটি অপরাধই সফল হয় তখন, যখন অপরাধীরা ভুক্তভোগীর স্বাভাবিক চিন্তাশক্তিকে ভয় বা আতঙ্কের মাধ্যমে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব
এখন পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়নি। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং ভুক্তভোগীদের বর্ণনা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ভীতি তৈরি করেছে। পুলিশ প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে সতর্ক রয়েছে এবং ঘটনাগুলোকে আপাতত ‘সামাজিক মাধ্যমের সতর্কতা’ হিসেবে দেখছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, নেপলসে এটি একেবারে নতুন কোনো কৌশল নয়। ২০১৮ সালেও সান জিওভান্নি আ তেদুচ্চিও (San Giovanni a Teduccio) এবং বাররা (Barra) এলাকায় একই ধরণের ঘটনার কথা শোনা গিয়েছিল। এমনকি নেপলসের ফোরচেল্লা (Forcella) এলাকাতেও এই ধরণের অদ্ভুত জালিয়াতির চল কয়েক দশক পুরনো।

অপরাধীদের আরও কিছু পরিচিত কৌশল
নেপলসে কেবল ইঁদুর নয়, গাড়ি চালকদের বিভ্রান্ত করতে অপরাধীরা আরও অনেক ধরণের ছক ব্যবহার করে থাকে। এর মধ্যে সবথেকে পরিচিত হলো ‘পাথর নিক্ষেপ’ (Sasso) বা ‘মার্বেল’ পদ্ধতি। কোনো গাড়ি যখন অপরাধীদের পাশ দিয়ে যায়, তখন তারা গাড়ির বডিতে একটি ছোট পাথর বা মার্বেল ছুড়ে শব্দ করে। এরপর চালককে থামিয়ে মিথ্যা দাবি করা হয় যে, তার গাড়ির ধাক্কায় অপরাধীদের গাড়ির আয়না ভেঙে গেছে। এরপর তাৎক্ষণিকভাবে নগদে ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তা ডাকাতি বা সশস্ত্র ছিনতাইয়ে রূপ নেয়।
আরেকটি পরিচিত কৌশল হলো গাড়ির সামনের কাঁচ বা উইন্ডশিল্ডে ‘ডিম নিক্ষেপ’। চলন্ত গাড়িতে ডিম ছুড়লে চালক স্বাভাবিকভাবেই ভাইপার বা জল ব্যবহার করে তা পরিষ্কার করতে যান। এতে ডিমের অংশগুলো পুরো কাঁচে ছড়িয়ে গিয়ে সামনের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ঝাপসা করে দেয়, যা চালককে অনিচ্ছাসত্ত্বেও গাড়ি থামাতে বাধ্য করে। এছাড়া সুপারমার্কেটের পার্কিং লটেও অপরাধীরা সক্রিয় থাকে। সেখানে “আপনার চাবি পড়ে গেছে” বা “টাকা পড়ে গেছে” বলে চালককে গাড়ি থেকে নামানোর পর বিপরীত দরজা দিয়ে ব্যাগ বা দামি ল্যাপটপ নিয়ে সটকে পড়ার নজির রয়েছে।
সামাজিক ফাঁদ ও প্রবাসীদের জন্য সতর্কতা
অপরাধীদের এই বিচিত্র কল্পনাশক্তি কেবল সড়কেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক সময় তারা মানুষের দয়া বা সহমর্মিতাকে পুঁজি করে। রাস্তার ধারে কেউ অসুস্থ হওয়ার ভান করে থাকে বা গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে বলে সাহায্যের আবেদন জানায়। দয়াপরবশ হয়ে কেউ গাড়ি থামালেই সে সর্বস্ব হারিয়ে ফেলে। এছাড়া ‘সেক্সি ট্র্যাপ’ বা যৌন প্রতারণাও বেশ সক্রিয়। কোনো নারী চালকের কাছে লিফট চেয়ে গাড়িতে ওঠে এবং পরবর্তীতে শ্লীলতাহানির মিথ্যা অভিযোগ এনে অর্থ দাবি করে, যা মূলত এক ধরণের সুপরিকল্পিত চাঁদাবাজি।
নেপলসে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশী বা যারা সেখানে যাতায়াত করেন, তাদের জন্য এই খবরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর সময় জানালা ও দরজা সবসময় লক করে রাখা এবং অপরিচিত কেউ গাড়িতে কিছু ছুড়লে বা অস্বাভাবিক কোনো শব্দ শুনলে নির্জন স্থানে গাড়ি না থামিয়ে নিকটস্থ জনবহুল এলাকা বা পুলিশ স্টেশনের দিকে চলে যাওয়া নিরাপদ। মনে রাখা প্রয়োজন, অপরাধীদের প্রধান অস্ত্র হলো মানুষের তাৎক্ষণিক আতঙ্ক, তাই পরিস্থিতি শান্তভাবে মোকাবিলা করাই সর্বোত্তম সুরক্ষা।
নেপলসে চলন্ত গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে মৃত ইঁদুর ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে গাড়ি ছিনতাইয়ের অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়েছে; তবে এ কৌশল নিয়ে এখনো পুলিশের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নেই।
napoli


