ইতালির লম্বারদিয়ায় অভিবাসী তরুণদের মধ্যে কমছে ধর্মীয় প্রভাব: এক নতুন জরিপ

4 Min Read

ইতালির লম্বারদিয়া অঞ্চলে বসবাসরত দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের মধ্যে ধর্মহীন হওয়ার প্রবণতা তাদের মা-বাবার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে এক সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে।

ইতালির অভিবাসন ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন বিষয়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখা গেছে যে, লম্বারদিয়া (Lombardia) অঞ্চলে বসবাসরত অভিবাসী পরিবারগুলোর দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্যদের মধ্যে ধর্মের প্রতি আনুগত্য বা সংশ্লিষ্টতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ‘বিওএনডি—অরিজিন এবং ডেস্টিনেশনের মধ্যে’ (BOnD – Between Origin and Destination) শীর্ষক এই জরিপটি পরিচালনা করেছে মিলান বিশ্ববিদ্যালয় (Università degli Studi di Milano), বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসমু ফাউন্ডেশন (Fondazione ISMU ETS)। গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল অভিবাসীদের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংহতির মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, লম্বারদিয়ায় বসবাসকারী অভিবাসন পটভূমির নাগরিকদের মধ্যে প্রায় প্রতি চারজনে একজন (২৩.৭ শতাংশ) দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণ জানিয়েছেন যে, তারা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করেন না বা কোনো ধর্মীয় পরিচয়ে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল মাত্র ১১.৩ শতাংশ। অর্থাৎ, মা-বাবার তুলনায় সন্তানদের মধ্যে ধর্মহীন বা নাস্তিক হওয়ার হার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত পরিচালিত এই জরিপে লম্বারদিয়া অঞ্চলের ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সী প্রায় ২,৮০০ জন অধিবাসীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। কারিপ্লো ফাউন্ডেশনের (Fondazione Cariplo) অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছে যে, অভিবাসী পরিবারগুলোতে ধর্মীয় বিশ্বাস মা-বাবার কাছ থেকে সন্তানদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত হচ্ছে না। মা-বাবা যে ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে ইতালিতে এসেছিলেন, তাদের সন্তানরা সেই একই পথ অনুসরণ না করে ভিন্ন সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পথ বেছে নিচ্ছেন।

ইতালির ধর্মীয় মানচিত্রে এই পরিবর্তনের প্রভাবও গবেষণায় বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লম্বারদিয়ায় মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা এখনও অভিবাসীদের মধ্যে বৃহত্তম ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। তবে তাদের হার প্রথম প্রজন্মের ৪১ শতাংশ থেকে কমে দ্বিতীয় প্রজন্মে ৩৬.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের হার প্রথম প্রজন্মের ১৩.৪ শতাংশ থেকে নাটকীয়ভাবে কমে দ্বিতীয় প্রজন্মে মাত্র ৬.১ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের হার উভয় প্রজন্মের মধ্যেই প্রায় স্থিতিশীল রয়েছে। প্রথম প্রজন্মে এই হার ২৩.৬ শতাংশ থাকলেও দ্বিতীয় প্রজন্মে তা সামান্য বেড়ে ২৪ শতাংশ হয়েছে। কিছু ক্ষুদ্রতর ধর্মীয় গোষ্ঠী যেমন জেহোভা’স উইটনেস এবং মর্মনদের অনুসারীদের সংখ্যাও ১.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.৬ শতাংশ হতে দেখা গেছে। তবে হিন্দু ও শিখ ধর্মাবলম্বীদের হার প্রথম প্রজন্মের ৩.৬ শতাংশের তুলনায় দ্বিতীয় প্রজন্মে ২.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের হার উভয় প্রজন্মের মধ্যেই ২.৮ শতাংশে স্থির রয়েছে। এছাড়া প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের হার অত্যন্ত সামান্য এবং তা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।

গবেষকরা মনে করছেন, এই পরিবর্তনের পেছনে ইতালীয় সমাজের সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং প্রাত্যহিক জীবনের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া বড় ভূমিকা রাখছে। অভিবাসীদের আদি দেশ বা সংস্কৃতির তুলনায় ইতালির স্থানীয় পরিবেশ ও জীবনযাত্রা দ্বিতীয় প্রজন্মের তরুণদের চিন্তাভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলছে। এটি কেবল ধর্মের ক্ষেত্রেই নয়, বরং তাদের সামগ্রিক জীবনদর্শন এবং সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জরিপের ফলাফল নীতিনির্ধারকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যারা অভিবাসীদের সামাজিক সংহতি এবং তরুণ প্রজন্মের মানসিকতা নিয়ে কাজ করছেন, তাদের জন্য এই তথ্যগুলো নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে। লম্বারদিয়ার মতো অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অভিবাসীদের এই সাংস্কৃতিক বিবর্তন ভবিষ্যতে ইতালির জনতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় চিত্রকে আরও বদলে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লম্বারদিয়ায় দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রতি চারজন অভিবাসীর প্রায় একজন কোনো ধর্মে নিজেকে সম্পৃক্ত মনে করেন না, যা প্রথম প্রজন্মের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি এবং ধর্মীয় পরিচয়ে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

integrazionemigranti

TAGGED:
Share This Article