২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে ইস্যু করা বিশেষ ভিজিটর ভিসায় কানাডায় ঢুকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে; শতাংশের হিসাবে এই তালিকায় সবার উপরে রয়েছে বাংলাদেশ।
ক্রীড়া উন্মাদনাকে পুঁজি করে উন্নত দেশে পাড়ি জমানোর এবং সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা নতুন কিছু নয়। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে কানাডায় বাংলাদেশিদের অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনের যে পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে, তা অভিবাসন বিশ্লেষকদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে। কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, বিশ্বকাপ দেখতে যাওয়া প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশির মধ্যে অন্তত একজন সেখানে পৌঁছানোর পর আর ফিরে আসেননি।
কানাডার খ্যাতনামা দৈনিক ‘দ্য গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ (The Globe and Mail) দেশটির অভিবাসন বিভাগ আইআরসিসি-র (IRCC) বরাত দিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, উত্তর আমেরিকার তিন দেশে অনুষ্ঠিত এই ফুটবল মহাযজ্ঞের সুযোগ নিয়ে অনেক পর্যটক ও ক্রীড়াপ্রেমী কানাডায় প্রবেশ করে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন জমা দিয়েছেন।
আইআরসিসি-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো (বিশেষ করে টরন্টো ও ভ্যানকুভারে অনুষ্ঠিত খেলাগুলো) দেখার জন্য বিদেশিদের অনুকূলে মোট ২৬ হাজার ১১১টি ফিফা-সংক্রান্ত সাময়িক বসবাসের অনুমতি বা বিশেষ ভিজিটর ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল। গত ২০ জুলাই পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, এই বিপুল সংখ্যক ভিসাধারীদের মধ্য থেকে অন্তত ১৭৫ জন ব্যক্তি কানাডায় পৌঁছানোর পর স্থায়ীভাবে বসবাসের লক্ষ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।

সংখ্যাগত দিক থেকে সর্বোচ্চ আবেদনকারীদের তালিকায় রয়েছে ঘানা ও চীন। এই দুই দেশ থেকে ২৫ জন করে নাগরিক অ্যাসাইলাম চেয়েছেন। এছাড়া মিসর, কলম্বিয়া ও কেনিয়া থেকে ১৫ জন করে এবং নাইজেরিয়া ও সেনেগাল থেকে ১০ জন করে ব্যক্তি একই পথে হেঁটেছেন। পাকিস্তান, নেপাল, বুরুন্ডি ও ইকুয়েডর থেকেও ৫ জন করে নাগরিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
তবে এই পুরো পরিসংখ্যানে বাংলাদেশের চিত্রটি সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে মাত্র ৪৫টি বিশেষ ভিজিটর ভিসা ইস্যু করা হয়েছিল। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই ৪৫ জনের মধ্যে ১০ জনই কানাডায় পৌঁছানোর পর ফিরে না আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পর্যটকদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই খেলা দেখার নাম করে কানাডায় স্থায়ী হওয়ার সুযোগ খুঁজছেন।
অভিবাসন বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক কোনো বড় ইভেন্টের সুযোগ নিয়ে এভাবে থেকে যাওয়ার প্রবণতা ভবিষ্যতে সাধারণ পর্যটক, শিক্ষার্থী কিংবা প্রকৃত ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য ভিসাপ্রাপ্তির পথ অত্যন্ত সংকুচিত করে তোলে। যখন একটি দেশের নাগরিকদের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা দেখা যায়, তখন সংশ্লিষ্ট উন্নত দেশগুলো সেই নির্দিষ্ট দেশের জন্য ভিসা নীতি আরও কঠোর করে ফেলে।
কানাডার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ অবশ্য টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা জারি করেছিল। তারা জানিয়েছিল, যদি কোনো ফুটবল টিকিটধারী বা পর্যটকের ক্ষেত্রে নিজ দেশে ফিরে না যাওয়ার ঝুঁকি বা সম্ভাবনা দেখা দেয়, তবে তাদের কানাডার সীমান্তে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হতে পারে। এত সতর্কতার পরেও ১৭৫ জনের এই অ্যাসাইলাম আবেদন কানাডার স্থানীয় রাজনীতি ও অভিবাসন মহলে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইআরসিসি-র ধারণা, এই আবেদনের সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। কারণ, বিশ্বকাপ দেখতে আসা অনেক পর্যটকের ভিসার মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি এবং তারা আবেদন করার জন্য আইনি সময়সীমার মধ্যেই রয়েছেন। এই ঘটনাটি বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশি পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যতে কানাডার ভিসা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশিদের জন্য বাড়তি কড়াকড়ি আরোপের শঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ দেখতে বাংলাদেশ থেকে কানাডার ভিজিটর ভিসা পেয়েছিলেন মাত্র ৪৫ জন; তাঁদের মধ্যে ১০ জন কানাডায় পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন।
prothomalo


