মৃত্যুপুরী মরুভূমি ও সাগর পাড়ি দিয়ে মিলানে নতুন জীবন: লুইস ও মুসলিমের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

4 Min Read

আফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন ও নাইজেরিয়া থেকে আসা দুই অভিবাসীর ইতালিতে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণামূলক কাহিনী সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা কুড়াচ্ছে। সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও নিয়মিত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কীভাবে তারা বর্তমানে মিলানের রাজপথে কার্গো বাইক নিয়ে কাজ করছেন, তাই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

ইতালির ব্যস্ততম শহর মিলান। প্রতিদিন সকালে রাজপথে অনেক ডেলিভারি রাইডারকে দেখা যায়, কিন্তু তাদের মধ্যে ২৪ বছর বয়সী লুইস ডোনাতিয়েন বিয়িহা (Louis Donatien Biyiha) এবং ২৯ বছর বয়সী মুসলিম মুবারকের (Muslim Mubarak) হাসিমুখ এক বিশেষ বার্তা বহন করে। তারা কেবল পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজই করছেন না, বরং দীর্ঘ এক অনিশ্চিত যাত্রার পর ইতালিতে নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছেন। লুইস এসেছেন ক্যামেরুন থেকে এবং মুসলিম নাইজেরিয়া থেকে। তারা দুজনেই ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ল্যাম্পেডুসা (Lampedusa) দ্বীপে পৌঁছান এবং বর্তমানে মিলানের একটি সামাজিক সমবায় প্রতিষ্ঠান ‘সো.ডে’ (So.De)-তে কাজ করছেন।

মৃত্যুফাঁদ পেরিয়ে ইতালির পথে

লুইসের যাত্রাটি ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ক্যামেরুনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে তিনি নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ইতালিতে পৌঁছানোর আগে তাকে নাইজেরিয়া, আলজেরিয়া এবং তিউনিসিয়া পাড়ি দিতে হয়েছিল। সাহারা মরুভূমি অতিক্রম করার সময় তিনি যে ভয়াবহতার মুখোমুখি হন, তা আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। লুইস জানান, মরুভূমিতে তাদের সাথে পর্যাপ্ত পানি ছিল না। তার সফরসঙ্গী মালি থেকে আসা বন্ধু বুবা পানিশূন্যতার কারণে তার চোখের সামনেই প্রাণ হারান। এই মৃত্যুভয় সাথে নিয়েই তিনি তিউনিসিয়ার স্ফ্যাক্স (Sfax) শহর থেকে একটি ছোট নৌকায় চড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেন।

ল্যাম্পেডুসায় পৌঁছানোর পর লুইসকে প্রথমে ইতালির কাম্পানিয়া (Campania) অঞ্চলে এবং পরবর্তীতে মিলানে স্থানান্তরিত করা হয়। মিলানের একটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র বা ‘চেন্ত্রো দি আক্কোলিয়েনজা’ (Centro di Accoglienza)-তে থাকাকালীন তার জীবন নতুন মোড় নেয়। সেখানে তিনি নিয়মিত ইতালীয় ভাষার প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ শুরু করেন।

সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও সো.ডে-র ভূমিকা

ইতালিতে নতুন জীবনের এই মোড়ে লুইসের পরিচয় হয় ফেদেরিকা (Federica) নামে এক সমাজকর্মীর সাথে। ফেদেরিকা অভিবাসীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে সহায়তা করেন। লুইসের ইতালীয় ভাষায় কথা বলার প্রচেষ্টা দেখে তিনি মুগ্ধ হন এবং তাকে ‘সো.ডে’ (So.De) নামক একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তাব দেন।

সো.ডে মূলত একটি টেকসই লজিস্টিক কোঅপারেটিভ বা সামাজিক সমবায়, যা ইতালিতে করোনা মহামারির সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর প্রধান লক্ষ্য হলো রাইডারদের ওপর শোষণ বন্ধ করে নিয়মিত কর্মসংস্থান এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। লুইস ও মুসলিম বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানের হয়ে পরিবেশবান্ধব কার্গো বাইকের মাধ্যমে মিলান শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে খাবার, ইনডোর প্ল্যান্ট এবং রেস্তোরাঁর মালামাল পৌঁছে দেন।

শোষণমুক্ত কর্মসংস্থান ও মর্যাদা

ইতালিতে অনেক অভিবাসী অনানুষ্ঠানিক খাতে বা দালালের মাধ্যমে কাজ করে শোষণের শিকার হলেও, লুইস ও মুসলিমের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তারা একটি নিয়মিত চুক্তির আওতায় কাজ করছেন, যেখানে কর্মঘণ্টা ও মজুরি সুনিশ্চিত। লুইস জানান, বর্তমানে তিনি তার সহকর্মী ও কাজের পরিবেশ নিয়ে অত্যন্ত আনন্দিত। তার মতে, ইতালীয় সমাজে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে ভাষা শিক্ষা এবং সঠিক কর্মসংস্থানই ছিল প্রধান হাতিয়ার।

এই দুই যুবকের কাহিনী কেবল তাদের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে যথাযথ সুযোগ এবং সঠিক আইনি কাঠামোর মধ্যে থাকলে একজন অভিবাসী কীভাবে সমাজের সম্পদে পরিণত হতে পারেন। লুইস ও মুসলিমের এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প মিলানের রাজপথে এখন প্রতিদিনের এক নতুন প্রেরণা। ইতালির অন্যান্য শহরগুলোতেও এমন মডেল অনুসরণ করার দাবি জানাচ্ছেন মানবাধিকার কর্মীরা, যাতে রাইডারদের অধিকার এবং অভিবাসীদের সামাজিক মর্যাদা রক্ষা পায়।

সমুদ্রপথে লাম্পেদুসায় পৌঁছানো ক্যামেরুনের লুইস ও নাইজেরিয়ার মুসলিম এখন মিলানের So.De সমবায়ে নিয়মিত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে কার্গো বাইকে পণ্য সরবরাহ করছেন, যা অভিবাসীদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি উদাহরণ।

corriere

TAGGED:
Share This Article