ইউরোপের বাইরে অভিবাসী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনে অনড় ইতালি: এবার লক্ষ্য আফ্রিকা মহাদেশ

4 Min Read

স্পেনের সিউটা সংকটের প্রেক্ষাপটে ‘আলবেনিয়া মডেল’ অনুসরণ করে আফ্রিকার মাটিতে নতুন অভিবাসী কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব দিচ্ছে মেলোনি সরকার; ইউরোপীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে ডেনমার্ক ও জার্মানি সমর্থন দিলেও তীব্র বিরোধিতায় নেমেছে ফ্রান্স ও স্পেন।

অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে থাকা ইতালির মেলোনি সরকার এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমানার বাইরে নতুন ‘প্রত্যাবাসন হাব’ বা কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা জোরালো করছে। সম্প্রতি স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটাতে (Ceuta) সৃষ্ট অভিবাসী সংকটকে কেন্দ্র করে ইতালি এই প্রস্তাব সামনে এনেছে। মূলত আলবেনিয়ার সাথে ইতালির যে বিশেষ অভিবাসন চুক্তি রয়েছে, সেই একই মডেলে এখন আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন দেশে কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে রোম। তবে এবারের প্রস্তাবের বিশেষত্ব হলো, এই কেন্দ্রগুলো সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়িত করার দাবি জানানো হয়েছে।

পালাজ্জো কিজি (ইতালির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) এবং ভিমিনালের (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়) ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, আগামী মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় এক জরুরি বৈঠকে এই প্রস্তাবটি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হবে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই বৈঠকে সমর্থন জানিয়েছে জার্মানি সহ ইউরোপের আরও ২১টি দেশ। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো, ফ্রান্স এবং স্পেন এই প্রস্তাবে এখন পর্যন্ত কোনো স্বাক্ষর করেনি। ইউরোপীয় কাউন্সিলের গত ১২ জুন কার্যকর হওয়া নতুন অভিবাসন বিধিমালাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেই এই কেন্দ্রগুলো গড়ে তোলার আইনি ভিত্তি খুঁজে পেয়েছে মেলোনি সরকার।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে দেশটির ডানপন্থী জোট এবং বামপন্থী বিরোধী দলগুলোর মধ্যে লড়াই তুঙ্গে। ইতালির ক্ষমতাসীন দল ফ্রাতেলি দ’ইতালিয়ার (FdI) শীর্ষ নেতা কার্লো ফিদাঞ্জা দাবি করেছেন, অভিবাসন ইস্যুতে বর্তমানে পুরো ইউরোপকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জর্জিয়া মেলোনি। তিনি শেঞ্জেন (Schengen) চুক্তি স্থগিত করার প্রশ্নে বিরোধীদের সমালোচনা করে বলেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ যখন ভেন্টিমিগ্লিয়া সীমান্তে গর্ভবতী নারীসহ অনিয়মিত অভিবাসীদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠিয়েছিলেন, তখন বামপন্থীদের এই ‘মানবিক ক্ষোভ’ কোথায় ছিল? ফিদাঞ্জার মতে, ফ্রান্স এখন এই চিঠি থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

এদিকে ইতালির উপ-প্রধানমন্ত্রী ও লেগা দলের নেতা মাত্তেও সালভিনি একে ‘সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান’ হিসেবে অভিহিত করে বলেছেন, দেশের সীমান্ত রক্ষা করা কোনো রাজনৈতিক প্রচার বা প্রোপাগান্ডা নয়, বরং এটি সরকারের দায়িত্ব। অভিবাসন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে মেলোনি সরকার দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন পেতে বদ্ধপরিকর, বিশেষ করে যখন সাবেক জেনারেল ভ্যানাক্সির মতো ব্যক্তিত্বরা ডানপন্থী ভোট ব্যাংককে প্রভাবিত করছেন। ফোরজা ইতালিয়ার পক্ষ থেকেও সানচেজের নমনীয় অভিবাসন নীতির কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, বিরোধী শিবির এই পুরো উদ্যোগকে ‘জাতীয় লজ্জা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা জুসেপ্পে কন্তে মেলোনির এই সিদ্ধান্তকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। কন্তে কেবল অভিবাসন ইস্যুতেই নয়, বরং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে কিয়েভকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তার দল কিয়েভকে অস্ত্র সরবরাহের পক্ষে ভোট দেবে না। এছাড়া ইতালি ভিভা দলের নেতা মাত্তেও রেনজি শেঞ্জেন চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তকে ‘অদূরদর্শী এবং অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা নারদেলা দাবি করেছেন, সরকার কেবল প্রোপাগান্ডা চালাচ্ছে যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই আনবে না।

রাজনৈতিক এই অস্থিরতার মধ্যেই আগামী মঙ্গলবার ব্রাসেলসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ানতেদোসি ইতালির এই উচ্চাভিলাষী প্রস্তাবটি পেশ করবেন। আফ্রিকা মহাদেশের কোন কোন দেশ এই কেন্দ্রগুলো স্থাপনের জন্য ইতালির সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে রাজি হবে এবং ইউরোপীয় কমিশন এই বিশাল প্রকল্পের অর্থায়নে শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেবে কি না—তা-ই এখন দেখার বিষয়। তবে এই প্রস্তাব যদি সফল হয়, তবে তা ইউরোপের অভিবাসন ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে, যা ইতালি এবং পুরো মহাদেশের অনিয়মিত অভিবাসী ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনতে পারে।

ইতালি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে আফ্রিকায় নতুন অভিবাসী প্রত্যাবাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব তুলতে যাচ্ছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য অনিয়মিত অভিবাসীদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা।

tg.la7

TAGGED:
Share This Article