ইতালির মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরে বিশ্ব প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর। উৎসবটির ‘ওরিজোন্তি’ বিভাগে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম কোনো বাংলাদেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি হিসেবে এই বৈশ্বিক মঞ্চে ইতিহাস গড়ল এটি।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রাচীন ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আয়োজন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে প্রদর্শিত হয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন মাইলফলক উন্মোচন করেছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। চলচ্চিত্র নির্মাতা রুবায়েত হোসেনের পরিচালনায় নির্মিত এই ছবিটি উৎসবের সম্মানজনক ‘ওরিজোন্তি’ প্রতিযোগিতামূলক বিভাগে বাছাই করা হয়েছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর শনিবার উৎসবের প্রধান কেন্দ্র ‘পালাজ্জো দেল সিনেমা’র সালা ক্যাসিনো প্রেক্ষাগৃহে স্থানীয় সময় রাত ৭টায় চলচ্চিত্রটির জমকালো বিশ্ব প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২:১৫ মিনিটে ‘সালা দারসেনা’ প্রেক্ষাগৃহে ছবিটির দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবারও আসত্রা ১ ও ২ প্রেক্ষাগৃহে দুটি পৃথক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতে থাকা এই উৎসবে অংশ নিতে চলচ্চিত্রটির শিল্পী ও কলাকুশলীদের একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে ইতালির ভেনিসে অবস্থান করছেন।
নির্মাতা রুবায়েত হোসেন জানান, বিগত প্রায় দুই দশক ধরে তিনি ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ছবিটির গল্প ও মূল ভাবধারা লালন করেছেন। শৈশবে ঢাকার একটি রূপচর্চা কেন্দ্রে শোনা গল্প, বিয়ের অনুষ্ঠানে কনেদের কান্নার দৃশ্য দেখে পাওয়া ভয় এবং মনে জমে থাকা অভিজ্ঞতা থেকে এই চলচ্চিত্রের মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে। ঢাকা শহরের একটি বিউটি পার্লার, বিয়ে এবং শৈশবের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে এর মূল প্রেক্ষাপট। চলচ্চিত্রটির মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে রুবায়েত হোসেন বলেন, “এই ছবির মাধ্যমে আমরা সৌন্দর্যের চিরাচরিত সামাজিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে চেয়েছি। কৃত্রিম সাজগোজের আড়ালে নারীদের কতটা শারীরিক ও মানসিক বেদনা সহ্য করতে হয়, তা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। বিউটি পার্লারকে মাধ্যম বানিয়ে সমাজ কীভাবে একটি মেয়েকে কৃত্রিম ছাঁচে ফেলে তথাকথিত ‘নারী’ বানিয়ে তোলে, তা চিত্রিত করা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে।”

চলচ্চিত্রটির অন্যতম ব্যতিক্রমী ও প্রশংসনীয় দিক হলো এর নেপথ্যের আন্তর্জাতিক কারিগরি ও সৃজনশীল দল। আবহ সঙ্গীত রচয়িতা ব্যতিরেকে প্রতিটি বিভাগের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন নারী পেশাদাররা। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘গোল্ডেন বিয়ার’ বিজয়ী পর্তুগিজ নির্মাতা লিওনর তেলেস এতে প্রধান চিত্রগ্রাহক বা সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেছেন। প্রধান আলো প্রযুক্তিবিদ হিসেবে ছিলেন ফেদেরিকা আর গোমেস, সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন ফ্রান্সের রাফায়েল মার্তাঁ-ওলজে এবং প্রোডাকশন ডিজাইন সামলেছেন ভারতের জোনাকী ভট্টাচার্য। নারীনির্ভর দল নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানিয়ে পরিচালক বলেন, “নারীরা ভালো চলচ্চিত্র বানাতে পারেন না—এই ভুল ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে এই ছবি। বিভিন্ন বিভাগের নারী টেকনিশিয়ানদের কাজ করার ক্ষমতা ও গতি ছিল এককথায় বিস্ময়কর।”
চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্রে অভিনয় করে পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে আত্মপ্রকাশ করেছেন জাইনিন চৌধুরী করিম। অভিনয়ে আসার আগে তিনি প্রায় দেড় বছর এই প্রকল্পের সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে অডিশনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় চরিত্রের জন্য মনোনীত হন। ছবিতে আরও অভিনয় করেছেন রিকিতা নন্দিনী শিমু ও সুনেরা বিনতে কামাল। কোনো সংলাপ না থাকা সত্ত্বেও সুনেরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাঁর চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন। এর আগে ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ক্যালকাটা’ ছবি নিয়ে ভেনিসে আসা শিমুর জন্য এটি দ্বিতীয়বারের মতো উৎসবে অংশগ্রহণ। এছাড়াও অতিথি চরিত্রে নজর কেড়েছেন আজমেরী হক বাঁধন ও দামীর খান।
বাংলাদেশের ‘খনা টকিজ’-এর পাশাপাশি ফ্রান্স, পর্তুগাল, নরওয়ে এবং জার্মানির আন্তর্জাতিক যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’। এ বছরের শেষ নাগাদ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনী শেষে আগামী বছর ছবিটি বাংলাদেশে সাধারণ দর্শকদের জন্য প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে।
রুবাইয়াত হোসেনের ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজন্তি প্রতিযোগিতায় বিশ্ব প্রিমিয়ারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে।
thedailystar


