ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে অনিয়মিত অভিবাসীদের সরিয়ে নিতে নতুন এক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে কিগালি; বর্তমান ইউরোপীয় নীতিমালার আলোকে এই উদ্যোগকে কার্যকর করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হওয়া বা বহিষ্কৃত অনিয়মিত অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনায় নতুন এক মেরুকরণ দেখা দিচ্ছে। আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডা জানিয়েছে, তারা ইউরোপের বেশ কিছু দেশের সঙ্গে অভিবাসীদের ‘ট্রানজিট’ বা সাময়িক আবাসস্থল হিসেবে কাজ করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে। রুয়ান্ডা সরকারের এই স্বীকারোক্তি এমন এক সময়ে এলো যখন ইউরোপজুড়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কঠোর নীতি গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে।
রুয়ান্ডা সরকারের মুখপাত্র ইয়োলান্ডে মাকোলো (Yolande Makolo) সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা এএফপি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, “আমরা বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের সাথে এ বিষয়ে প্রাথমিক স্তরের আলোচনা শুরু করেছি, তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি।” যদিও মাকোলো আলোচনারত দেশগুলোর নাম স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেননি, তবে ইতালির সাথে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি হয়েছে কিনা— এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না হলেও দেশটির সাথে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য, ইতালির সাথে ইতিমধ্যে আলবেনিয়ার একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে, যার আওতায় ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের আলবেনিয়ায় নির্মিত ট্রানজিট কেন্দ্রে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। রুয়ান্ডা মূলত এই ধরনের প্রক্রিয়ার অংশ হতে আগ্রহী। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় গাশোরা (Gashora) নামক স্থানে একটি ‘জরুরি ট্রানজিট ব্যবস্থা’ বা ইটিএম (Emergency Transit Mechanism- ETM) আগে থেকেই সচল রয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR)-এর উদ্যোগে লিবিয়ার আটক কেন্দ্রগুলো থেকে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসীদের জীবন বাঁচাতে এই কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে পরবর্তীতে তাদের পশ্চিমা দেশগুলোতে পুনর্বাসিত করা হয়।

ইয়োলান্ডে মাকোলো এই সফল অভিজ্ঞতাকেই ইউরোপীয় দেশগুলোর সামনে তুলে ধরছেন। তিনি জানান, গাশোরার কেন্দ্রে অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্য চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ এবং বিশ্রামের সুব্যবস্থা রয়েছে। এখান থেকেই তাদের আশ্রয়ের আবেদনগুলো প্রক্রিয়া করা হয়। যারা নিরাপদ মনে করেন তারা নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন অথবা অন্য কোনো দেশে পুনর্বাসিত হওয়ার সুযোগ পান। ২০১৯ সাল থেকে এই প্রক্রিয়ায় লিবিয়া থেকে হাজার হাজার অভিবাসীকে সরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে অনেক মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ইউরোপ থেকে অভিবাসীদের রুয়ান্ডায় পাঠানোর চেষ্টা এবারই প্রথম নয়। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের সাবেক কনজারভেটিভ সরকার আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে রুয়ান্ডার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিল। তবে আইনি চ্যালেঞ্জ এবং পরবর্তীতে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের (Keir Starmer) সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই চুক্তিটি বাতিল করে দেওয়া হয়।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন। গত জুন মাসে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট অভিবাসন নিয়ে একটি নতুন বিধিমালা অনুমোদন করেছে। এই বিধিমালার অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলো তাদের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে আটক কেন্দ্র বা ট্রানজিট কেন্দ্র স্থাপনের জন্য তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার আইনি সুযোগ পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নতুন অবস্থান রুয়ান্ডার মতো দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনার পথ আরও সুগম করেছে।
যদিও রুয়ান্ডা সরকার একে একটি মানবিক উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করছে, তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, অভিবাসীদের ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে আফ্রিকায় পাঠিয়ে দেওয়া তাদের আইনি অধিকারকে সংকুচিত করতে পারে। তবুও, অভিবাসন চাপ কমাতে মরিয়া ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে রুয়ান্ডার এই ট্রানজিট প্রস্তাব একটি বড় বিকল্প সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপ থেকে বহিষ্কৃত অনিয়মিত অভিবাসীদের ট্রানজিট ও প্রক্রিয়াকরণে রুয়ান্ডার সঙ্গে কয়েকটি দেশের প্রাথমিক আলোচনা চলছে তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
infomigrants


