রোমে বাংলাদেশি পরিবার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত শাহাদাত বলকান রুট হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার সন্দেহ

4 Min Read

লুট করা অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে ইউরোপ ছেড়েছেন অভিযুক্ত ঘাতক; সম্পর্কের জটিলতা ও পূর্ববর্তী হুমকির সূত্র ধরে তদন্ত জোরদার করেছে ইতালির গোয়েন্দা সংস্থা।

ইতালির রাজধানী রোমের কাসালোত্তি (Casalotti) এলাকায় এক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারের তিন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন (৪৩) ইউরোপ ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছেন বলে ধারণা করছেন দেশটির তদন্তকারী কর্মকর্তারা। গত ২৬ জুনের সেই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর ভুক্তভোগীদের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে বলকান অঞ্চলের সার্বিয়া হয়ে তিনি ইতালি ত্যাগ করেছেন বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে। ইতালির ভেতরে ভেনিসে তাঁর সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত করা গেলেও এর পর থেকে তাঁর আর কোনো সন্ধান মেলেনি।

রোম পুলিশের তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ভিয়া মনতিলিওর (Via Montiglio) একটি ফ্ল্যাটে ধারালো চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কামাল উদ্দিন, তাঁর স্ত্রী জাহান এবং তাঁদের আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান আরোয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। নিহতদের মরদেহ সোফার পেছনে ও খাটের নিচে লুকিয়ে রেখে ব্লিচিং পাউডার দিয়ে মেঝে থেকে রক্ত ও অপরাধের আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করছিলেন অভিযুক্ত শাহাদাত। ঠিক তখনই ওই দম্পতির বড় ছেলে ২০ বছর বয়সী আমির কাজ শেষে ঘরে ফিরলে তাঁর ওপরও অতর্কিত হামলা চালানো হয়। মাথায় ও শরীরে গুরুতর আঘাত পেয়ে আমির প্রাণে বেঁচে গেলেও ঘরে থাকা বিপুল পরিমাণ নগদ ইউরো ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে চম্পট দেন শাহাদাত।

ঘটনার প্রায় এক মাস পর হাসপাতাল থেকে ফিরে আমির পুলিশি উপস্থিতিতে তালাবদ্ধ ঘরে প্রবেশ করলে অর্থ ও মূল্যবান গহনা খোয়া যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তদন্তকারী দলের অনুমান, রোম থেকে ভেনিস হয়ে সার্বিয়া ও পরবর্তীতে বাংলাদেশে পৌঁছানোর দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রার খরচ জোগাতে শাহাদাত ওই লুট করা অর্থ ব্যবহার করেছিলেন। ঘটনার পরপরই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলের সন্নিকটে ভিয়া ক্লোভিওতে (Via Clovio) প্রবাসীদের একটি মেসে তল্লাশি চালানো হলেও শাহাদাতকে পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, শহর ছাড়ার আগপর্যন্ত পরিচিত কোনো চক্র তাঁকে আত্মগোপনে সহায়তা করেছিল। পরবর্তীতে বোলোনিয়া ট্রেন স্টেশনে তাঁকে দেখা যাওয়ার খবরটি ভুল প্রমাণিত হলেও ভেনিস পর্যন্ত তাঁর বাসে ভ্রমণের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের বিশ্বাস, একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের সাহায্যে ট্রেন ও বাসে বলকান রুট ব্যবহার করে সার্বিয়া হয়ে তিনি ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ উদঘাটনে নিহতদের ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। শাহাদাত এই পরিবারের বহু পুরোনো পরিচিত ছিলেন এবং নিহত জাহানের সাথে বাংলাদেশে থাকাকালীন তরুণ বয়স থেকেই তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল। ইংল্যান্ডে নিজের স্ত্রী ও কন্যাকে ছেড়ে শাহাদাত ইতালি চলে আসার পর কামাল উদ্দিন নিজেই তাঁকে রোমে আবাসন খুঁজে পেতে সহায়তা করেছিলেন। তবে নিহত জাহানের মুঠোফোনের একাধিক ব্যক্তিগত বার্তা ও কলরেকর্ড পর্যালোচনা করে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে, তাঁদের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি জটিল বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক বজায় ছিল।

এদিকে চুরির বিষয়টি সামনে আসার পর কামালের বাবার পাওয়া একটি হুমকি চিঠির বিষয়টিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক বছর আগে বাংলাদেশে অবস্থানকালে কামালের বাবা একটি উড়ো চিঠি পেয়েছিলেন, যেখানে প্রবাসে থাকা ছেলে এবং তাঁর স্ত্রী ও কন্যাসন্তানকে হত্যার হুমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা ও স্বর্ণ দাবি করা হয়েছিল। পরকীয়ার টানাপোড়েন, পূর্বপরিকল্পিত চাঁদাবাজি নাকি অর্থলোভ—কোন কারণে এই পৈশাচিক ঘটনাটি ঘটেছে, তা নিশ্চিত হতে এবং পলাতক আসামিকে আইনের আওতায় আনতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইতালি পুলিশ।


রোমের কাসালোত্তিতে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় পলাতক ৪৩ বছর বয়সী শাহাদাত হোসেনের শেষ ইতালীয় অবস্থান ভেনিস; তদন্তকারীদের ধারণা, তিনি বলকান হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে থাকতে পারেন।

ilmessaggero

Share This Article