ডিপোর্টেশন এড়াতে কারাগারে ভুয়া সনদের গোপন নির্দেশিকা: প্রাতোয় নড়েচড়ে বসেছে ইতালির প্রসিকিউশন

4 Min Read

অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন কেন্দ্র বা সিপিআরে পাঠানো ঠেকাতে প্রাতো কারাগারে দুই পাতার এক হাতে লেখা গাইডলাইন উদ্ধারের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হতে যাচ্ছে; এর নেপথ্যে দেশজুড়ে সক্রিয় সিন্ডিকেটের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইতালির টাস্কানি অঞ্চলের প্রাতো শহরের কেন্দ্রীয় কারাগারে (Carcere di Prato) অবৈধ অভিবাসীদের দেশ থেকে বহিষ্কার ঠেকানোর এক চাঞ্চল্যকর অপকৌশল ফাঁস হয়েছে। কারাগারের ভেতর থেকে গোপনে ছবি তোলা দুই পাতার একটি হাতে লেখা নির্দেশিকা বা ভাদেম্যাকাম (vademecum) এখন দেশটির বিচার বিভাগের নজরে এসেছে। নথিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কীভাবে চিকিৎসাগত অজুহাত ও ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন কেন্দ্র বা সিপিআরে (CPR – Centri di permanenza e rimpatrio) স্থানান্তর আটকানো যায়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তোলপাড় শুরু হয়েছে এবং প্রাতোর প্রধান সরকারি কৌঁসুলি (Procuratore di Prato) এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি তদন্ত শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

উদ্ধার হওয়া ওই গোপন নোটে দেখা যায়, অভিবাসীদের ডিপোর্টেশন এড়াতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল বা চাতুরির (escamotage) পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর একটি হলো, অভিবাসীকে সরাসরি সিপিআরের জন্য ‘চিকিৎসাগতভাবে অনুপযুক্ত’ হিসেবে প্রত্যয়ন করা। তবে নথিতেই সতর্ক করে বলা হয়েছে, এমন সরাসরি পদক্ষেপে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আইনি জালিয়াতি বা দাপ্তরিক মিথ্যাচারের (falso ideologico) অভিযোগ ওঠার ঝুঁকি থাকে। ফলে আইনি ফাঁকফোকর হিসেবে বন্দি অভিবাসীর তীব্র মানসিক সংকট ও মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণাকে (sofferenza psichica) সামনে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রত্যাবাসন কেন্দ্রগুলোকে ‘রোগ সৃষ্টিকারী বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ’ (patogeni) হিসেবে প্রমাণের কৌশল শেখানো হয়েছে, যাতে আদালত বা কর্তৃপক্ষ সেখানে অভিবাসীকে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়। শুধু তাই নয়, কারারক্ষীদের আকস্মিক তল্লাশির (perquisizione) মুখোমুখি হলে কীভাবে আচরণ করতে হবে, তারও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া রয়েছে সেখানে।

প্রাতোর এই নির্দেশিকায় দেশটির রাভেনা (Ravenna) শহরের সাম্প্রতিক একটি স্পর্শকাতর তদন্তের সরাসরি উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ্য, রাভেনার বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অভিবাসীদের বহিষ্কার আটকাতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা মেডিকেল সার্টিফিকেট দেওয়ার অভিযোগে বর্তমানে বিচারিক তদন্ত চলছে। ফাঁস হওয়া নথিতে ওই চিকিৎসকদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন জানিয়ে উল্লেখ করা হয়, বিতর্কিত ‘নো সিপিআর’ (No CPR) আন্দোলনকে বেগবান করতেই চিকিৎসকরা এমন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তারা জয়ী হবেন। এই তথ্যের মাধ্যমে তদন্তকারীরা ধারণা করছেন, কারাগারের ভেতরে এই নির্দেশনা প্রচারের পেছনে অভিবাসনবিরোধী আইন বানচালের সুপরিকল্পিত উদ্যোগ কাজ করছে।

প্রসিকিউশন ও সংশ্লিষ্ট মহলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই গোপন নির্দেশিকা নিছক বন্দিদের সাধারণ কোনো নোট নয়; বরং রাষ্ট্রের বৈধ বহিষ্কার প্রক্রিয়াকে সুপরিকল্পিতভাবে অকার্যকর করার এক সুস্পষ্ট প্রয়াস। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছে, রাভেনার চিকিৎসকদের ঘটনা এবং প্রাতো কারাগারের এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বরং ইতালিজুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকাতে একটি সুসংগঠিত চক্র বা প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। এ ঘটনার পর কেবল কারাগার বা চিকিৎসকদের পর্যায়েই নয়, বরং প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চপর্যায়ে কার কার যোগসাজশ রয়েছে তা-ও খতিয়ে দেখার জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ইতালিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য সিপিআর কেন্দ্রগুলো দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল ও বিতর্কিত ইস্যু। আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের পূর্বশর্ত হিসেবে এসব কেন্দ্রে সাময়িকভাবে আটক রাখা হয়। তবে প্রাতো কারাগারের এই নতুন ঘটনাটি অভিবাসীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়োজিত চিকিৎসাব্যবস্থার নিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রত্যাবাসন আইনের কার্যকারিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত জোরদার হলে আগামী দিনগুলোতে বন্দি অভিবাসীদের মেডিকেল ছাড়পত্র যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আরও কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


প্রাতোর কারাগারে উদ্ধার হাতে লেখা নথিতে মানসিক অসুস্থতা ও চিকিৎসা সনদের মাধ্যমে অভিবাসীদের সিপিআর থেকে সরানোর কৌশলের ইঙ্গিত; নথিগুলো খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু হতে পারে।

tgcom24

Share This Article