ইতালিতে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে পাড়ার কফি বার: দিনে গড়ে ১১টি ব্যবসা হারিয়ে বিপাকে অর্থনীতি

4 Min Read

গত ছয় বছরে দেশটিতে ২৪ হাজারের বেশি বার বন্ধ হওয়ায় ৭২০ কোটি ইউরোরও বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠন কনফেজেরচেন্তি; সংকট কাটাতে নাগরিকদের নিয়ে নতুন আইনের প্রস্তাব।

ইতালির দৈনন্দিন সামাজিক জীবনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ও ঐতিহ্যের প্রতীক স্থানীয় কফি বারগুলো আশঙ্কাজনক হারে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী ছয় বছরে দেশজুড়ে ২৪ হাজারের বেশি বার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১১টির সমান। কেবল সামাজিক মেলামেশার জায়গা হারানোর দিক থেকেই নয়, এই ব্যাপক ব্যবসায়িক পতনে দেশটির স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। ইতালির ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী সমিতি কনফেজেরচেন্তির (Confesercenti) সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বার বন্ধের কারণে বিগত ছয় বছরে স্থানীয় অর্থনীতিতে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন (৭২০ কোটি) ইউরোর বেশি ক্ষতি হয়েছে।

ইতালির চেম্বার অব কমার্সের (Camere di commercio) তথ্য বিশ্লেষণ করে কনফেজেরচেন্তি জানিয়েছে, ২০১৯ সালে দেশটিতে পানীয় ও কফি সেবাদাতা মোট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮৩৯টি। ২০২৫ সালে এসে তা ১৪ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৬টিতে। সমিতিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের শাটার নেমে যাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, বিপুলসংখ্যক কর্মসংস্থান নষ্ট হয়েছে এবং সরকারি রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাণিজ্যিক স্থবিরতা বা এই বন্ধ্যাত্ব ইতালির সব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লেও মধ্য ইতালির পরিস্থিতি সবচেয়ে আশঙ্কাজনক। এই অঞ্চলে ২০১৯ সালের তুলনায় বারের সংখ্যা ২০ দশমিক ৮ শতাংশ বা ৭ হাজার ৩২৩টি হ্রাস পেয়েছে, যা মোট সংখ্যার এক-পঞ্চমাংশের বেশি। এছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ পতন রেকর্ড করা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষতির মাত্রা কিছুটা কম হলেও তা নেতিবাচক (৬ দশমিক ৭ শতাংশ হ্রাস) এবং দ্বীপ অঞ্চলগুলোতে কমেছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ।

সংখ্যাগত দিক থেকে একক অঞ্চল হিসেবে সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র লোম্বারদিয়া (Lombardia), যেখানে ৪ হাজার ৯৫৭টি বার বন্ধ হয়েছে। এরপরেই রয়েছে লাৎসিও (৪,৪০৫টি), ভেনেতো (২,৮০৬টি), এমিলিয়া-রোমানিয়া (১,৯১৬টি) এবং পিয়েমন্তে (১,৯১৫টি)। তবে শতাংশের হিসাবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে মার্কে (Marche) অঞ্চল; সেখানে মোট বারের এক-চতুর্থাংশ বা ২৫ শতাংশই বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া লাৎসিওতে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ, ভালে দ’আওস্তায় ২২ দশমিক ২ শতাংশ এবং ভেনেতোতে ২০ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে।

শহরভিত্তিক পর্যালোচনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে রাজধানী রোমে। ঐতিহ্যবাহী এই নগরীতে ২ হাজার ৮২৭টির বেশি বার বন্ধ হয়েছে, যা শহরটির মোট বারের ৩০ শতাংশেরও বেশি। কনফেজেরচেন্তি বিষয়টিকে একটি গভীর ‘রক্তক্ষরণ’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতে রেকর্ড পরিমাণ আন্তর্জাতিক পর্যটকের আগমন ঘটলেও পাড়া-মহল্লার পরিচিত দোকানগুলোর পতন কোনোভাবেই ঠেকানো যায়নি।

এই সংকট তুলে ধরে কনফেজেরচেন্তির সভাপতি নিকো গ্রোঙ্কি মন্তব্য করেন, বাণিজ্যিক বন্ধ্যাত্ব স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রাকে আমূল বদলে দিচ্ছে। এই পতন ঠেকাতে সংগঠনটি প্রতিটি প্রাদেশিক রাজধানীতে স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। একই সাথে শহরের প্রাণকেন্দ্রগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং পাড়া-মহল্লার ছোট ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে নাগরিকদের স্বাক্ষরে একটি নতুন গণ-উদ্যোগ আইন (proposta di legge di iniziativa popolare) পাসের প্রস্তাব তোলা হয়েছে। গ্রোঙ্কি জোর দিয়ে বলেন, স্থানীয় ব্যবসাকে রক্ষা করার অর্থ হলো স্থানীয় কর্মসংস্থান, নাগরিক সেবা এবং মানুষের একে অপরের সাথে দেখা করার ঐতিহাসিক পরিবেশকে বাঁচিয়ে রাখা।


২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ইতালিতে ২৪ হাজারের বেশি বার বন্ধ হয়েছে; এতে স্থানীয় অর্থনীতিতে ৭.২ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি ক্ষতি হয়েছে এবং সামাজিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে।

ansa

Share This Article