সাগরপথে ইতালিতে অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যায় বড় ধস: শীর্ষে বাংলাদেশ, কঠোর হচ্ছে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া

4 Min Read

ইতালিতে অবৈধ পথে অভিবাসীদের আগমনের হার গত দুই বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কমেছে; বিপরীতে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বা প্রত্যাবাসনের সংখ্যায় বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে।

ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ভিমিনালে (Viminale)-র সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে ইতালিতে অভিবাসী প্রবেশের ক্ষেত্রে এক অভাবনীয় পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে। সরকারি ‘ক্রুশকোত্তো স্তাতিস্তিকো’ বা পরিসংখ্যান ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত ইতালিতে সাগরপথে মোট ১৭ হাজার ১৭৬ জন অভিবাসী অবতরণ করেছেন। অথচ গত বছরের ঠিক একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৯৫২ জন এবং ২০২৪ সালে ছিল ৩৬ হাজার ৩৭০ জন। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর অভিবাসীদের আসার হার প্রায় ৫৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

শীর্ষে বাংলাদেশিরা: জাতীয়তা ভিত্তিক পরিসংখ্যান

ইতালিতে আসা অভিবাসীদের জাতীয়তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ বছরও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আসা মানুষের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশের নাগরিকরা। বছরের প্রথম সাত মাসে মোট ৪ হাজার ৬৯৫ জন বাংলাদেশি ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। তালিকায় এর পরেই রয়েছে সোমালিয়া (১,৯৮১ জন), আলজেরিয়া (১,৭৪৯ জন), সুদান (১,৪৪৭ জন) এবং পাকিস্তান (১,২৮৯ জন)। এছাড়া মিশর, ইরিত্রিয়া, তিউনিসিয়া এবং নাইজেরিয়ার নাগরিকরাও এই তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছেন। তবে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, সঙ্গীহীন নাবালক বা অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গত বছর যেখানে ৬ হাজার ৮৪৯ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এসেছিল, এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৩১২ জনে।

ল্যাম্পেডুসার পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক উন্নতি

ইতালির অন্যতম প্রবেশদ্বার ল্যাম্পেডুসা ও লিনোসা দ্বীপের মেয়র ফিলিপ্পো মান্নিনো বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে যখন কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দ্বীপে ১০ হাজার অভিবাসী এসে পৌঁছেছিল, তখন থেকে সরকার যে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, তার ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। মেয়র মান্নিনো জানান, বর্তমানে অভিবাসীদের দ্রুত স্থানান্তর এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক আমূল পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে রেড ক্রস বা ক্রোচে রোসা (Croce Rossa)-র পেশাদার ও মানবিক ব্যবস্থাপনার কারণে অভিবাসী ক্যাম্প বা ‘হটস্পট’গুলোতে আর আগের মতো উপচে পড়া ভিড় তৈরি হচ্ছে না। তবে তিনি উপকূলে ডুবে যাওয়া নৌকাগুলোর অবশিষ্টাংশ পরিষ্কার করার চ্যালেঞ্জটি সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

প্রত্যাবাসন বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর হার বৃদ্ধি

অভিবাসী আসার সংখ্যা কমলেও দেশটিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। বছরের প্রথম সাত মাসেই ৫ হাজার ২৪৭ জন অভিবাসীকে ইতালি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই সংখ্যা গত বছর ছিল ৩ হাজার ৯৩৭ এবং ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ২৯১ জন। চলতি বছর প্রত্যাবাসিতদের মধ্যে ৪ হাজার ৫১৩ জনকে প্রশাসনিক নির্দেশে জোরপূর্বক (Forced Repatriation) ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং ৭৩৪ জন স্বেচ্ছায় সহায়তার মাধ্যমে (Voluntary and Assisted Return) নিজ দেশে ফিরে গেছেন।

পটভূমি ও তাৎপর্য

ইতালিতে অভিবাসনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৮১ হাজার ৪৩৬ জন এবং ২০২৩ সালে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫১ জন অভিবাসী এসেছিল। বিপরীতে ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল সর্বনিম্ন (১১,৪৭১ জন)। বর্তমান সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতি এবং উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর সাথে করা চুক্তিগুলোর কারণে এই সংখ্যা কমছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তারা এখনো ইতালিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অবৈধ পথে আসার ঝুঁকি এবং সরকারের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাবাসন নীতি অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

ভবিষ্যতে এই সংখ্যা আরও কমানোর জন্য ইতালি সরকার ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সাথে সমন্বয় বাড়িয়ে তৃতীয় দেশগুলোর সাথে নতুন নতুন চুক্তি করার দিকে নজর দিচ্ছে। একইসাথে যারা বৈধ নথিপত্রহীন ভাবে ইতালিতে অবস্থান করছেন, তাদের ক্ষেত্রেও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও জোরালো করার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০২৬ সালে ইতালিতে অভিবাসী আগমন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—১০ আগস্ট পর্যন্ত ১৭,১৭৬ জন, যা ২০২৫ ও ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম; একই সঙ্গে বেড়েছে প্রত্যাবাসন।

ansa

Share This Article