রোমের কাসালত্তি এলাকায় নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার একই পরিবারের তিন বাংলাদেশির শেষ জানাজা ও বিদায় অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। শোকাতুর পরিবেশে স্থানীয় বাসিন্দারা নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি বেঁচে যাওয়া একমাত্র সন্তান আমিরের কর্মসংস্থান ও আইনি সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন।
ইতালির রাজধানী রোমের কাসালত্তি (Casalotti) এলাকায় গত ২৬ জুন ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারানো তিন বাংলাদেশির মরদেহ দেশের মাটিতে পাঠানোর প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। নিহত কামাল উদ্দিন (৪০), তাঁর স্ত্রী হোসনে জাহান মমতাজ (৩৮) এবং তাঁদের আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান আরওয়ার কফিনগুলো মঙ্গলবার সন্ধ্যায় স্থানীয় পিয়াজ্জা ওরমিয়া (Piazza Ormea)-তে নিয়ে আসা হয়। সেখানে দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী এবং স্থানীয় ইতালীয়রা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাঁদের শেষ শ্রদ্ধা জানান। এর আগে পলিক্লিনিকো জেমেলি (Policlinico Gemelli) হাসপাতালে ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী মরদেহগুলোর গোসল ও পবিত্রকরণ সম্পন্ন করা হয়।
নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও আমিরের বেঁচে ফেরা
গত ২৬ জুন ভিয়া মন্তিলিও (Via Montiglio)-র একটি অ্যাপার্টমেন্টে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত ঘাতক শাহাদাত হোসেন (৪৩) একটি ধারালো চাপাতি দিয়ে পুরো পরিবারটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই হামলায় কামালের ২০ বছর বয়সী বড় ছেলে আমির আইয়ান অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ঘটনার সময় আমির কাজ থেকে ফিরে বাড়িতে ঢুকতেই পেছন থেকে তাঁর ওপর হামলা চালায় শাহাদাত। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া সত্ত্বেও আমির সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে রাস্তায় নেমে আসতে সক্ষম হন। ঠিক সেই সময় পথচারীরা চলে আসায় ঘাতক শাহাদাত পালিয়ে যায়। বর্তমানে আমির ৩০ দিনের শারীরিক অসুস্থতার ছাড়পত্র বা প্রগনসিস (Prognosis)-এ চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘাতকের সন্ধানে পুলিশ
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ঘাতক শাহাদাত হোসেন পলাতক। পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, শাহাদাত বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী। ধারণা করা হচ্ছে, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সে জাল নথিপত্রের সাহায্যে ইতালি ত্যাগ করে বাংলাদেশে পালিয়ে গেছে। রোম পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ স্কুয়াদ্রা মবিলে (Squadra Mobile) এবং এর প্রধান রবার্তো জুসেপ্পে পিতিত্তো এই ঘটনার তদন্ত করছেন। শাহাদাতের ভাইকে ইতিমধ্যেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং পুলিশের সন্দেহ, পালানোর পথে শাহাদাতকে অন্য কেউ সহযোগিতা করেছে।

কাসালত্তি এলাকার মানবিকতা ও আমিরের কর্মসংস্থান
নিহত কামাল উদ্দিন দীর্ঘকাল ধরে কাসালত্তির ‘ডেম’ (Dem) সুপারমার্কেটে কর্মরত ছিলেন এবং স্থানীয়দের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় মুখ ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে পুরো এলাকা শোকে স্তব্ধ। স্থানীয় বাসিন্দারা আমিরের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছেন। সবচেয়ে বড় আশার সংবাদ হলো, এলাকার ‘আইপারফ্যামিলি’ (Iperfamily) নামক একটি সুপারমার্কেট আমিরকে আগামী আট মাসের জন্য চাকরিতে নিয়োগ দিয়েছে। সুস্থ হয়ে ফেরার পর আমির সেখানে কাজ শুরু করতে পারবেন।
মিউনিসিপ্যালিটি বা রোমের ১৩ নম্বর মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের সদস্য কার্লো মাত্তিয়া বলেন, “কাসালত্তি আজ নীরবতায় একাত্ম হয়ে কামাল, জাহান এবং ছোট্ট আরওয়াকে বিদায় জানাচ্ছে। আমরা আমিরের পাশে আছি এবং তাকে নিশ্চিত করতে চাই যে এই এলাকা তার পরিবারকে কখনো ভুলবে না।”
আইনি ও নথিপত্র সংক্রান্ত জটিলতা
হত্যাকাণ্ডের পর আমিরের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়েছিল কারণ তাঁর পাসপোর্ট ও ইতালিতে বসবাসের অনুমতিপত্র বা পেরমেসো দি সোজর্নো (Permesso di Soggiorno) অ্যাপার্টমেন্ট থেকে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক শাহাদাত যাওয়ার সময় এগুলো সঙ্গে নিয়ে গেছে। আমিরের আইনজীবী ফ্যাব্রিজিও গ্যালো রোমস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় দ্রুত ডুপ্লিকেট নথিপত্র সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছেন। আইনজীবী গ্যালো জানান, “নথিপত্র হাতে পাওয়ায় এখন আমির তাঁর বাবা-মা ও বোনের মরদেহ নিয়ে বাংলাদেশে যেতে পারবেন এবং চাইলে পরবর্তীতে ইতালিতে ফিরে আসতে পারবেন।”
পারিবারিক কোন্দল নাকি পূর্বপরিকল্পিত শত্রুতা—হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো তদন্তাধীন। তবে রোমের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং স্থানীয় ইতালীয় সমাজের এই নজিরবিহীন ঐক্য ও সহানুভূতি আমিরের ভবিষ্যৎ পথচলায় বড় অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মরদেহগুলো কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে পাঠানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কাসালত্তি হত্যাকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি পরিবারের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে; একমাত্র বেঁচে যাওয়া আমিরের পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয়রা, পাশাপাশি আট মাসের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও হয়েছে।
roma.repubblica


