ইতালির জাতীয় কারুশিল্প ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফেডারেশন (CNA)-র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইতালীয়দের কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় সময়ের চেয়ে প্রায় সাড়ে চার বছর কম। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে নারীদের কম অংশগ্রহণ এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দেশটির অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
ইউরোপের অন্যান্য উন্নত দেশের তুলনায় ইতালিতে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেলেও কর্মক্ষেত্রে কাটানো সময়ের হিসেবে দেশটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ইতালির ন্যাশনাল কনফেডারেশন অফ ক্রাফটস অ্যান্ড স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস বা সিএনএ (CNA)-র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ইতালীয়রা তাদের জীবনের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের বাইরে কাটাচ্ছেন। ২০২৫ সালের সম্ভাব্য শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।
ইউরোপীয় গড় ও ইতালির অবস্থান
সিএনএ-র গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইতালিতে একজন কর্মজীবীর প্রত্যাশিত কর্মজীবন হবে মাত্র ৩৩ বছর। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন হার। এই তালিকায় ইতালির পেছনে কেবল রোমানিয়া অবস্থান করছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় কর্মজীবনের সময়কাল ৩৭.৫ বছর। অর্থাৎ, একজন সাধারণ ইউরোপীয় নাগরিকের তুলনায় ইতালীয়রা গড়ে সাড়ে চার বছর কম সময় কর্মক্ষেত্রে অতিবাহিত করেন।
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে ইতালিতে কর্মজীবনের দৈর্ঘ্য মাত্র ২ মাস বেড়েছে। তবে এই সামান্য উন্নতিও ইইউভুক্ত দেশগুলোর গড় উন্নতির চেয়ে কম, কারণ ইইউর অন্যান্য দেশে এই বৃদ্ধির হার গড়ে ৩ মাস। গত এক দশকে ইতালি কিছুটা এগোলেও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দেশের তুলনায় ব্যবধান কমানোর জন্য তা যথেষ্ট নয়।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা
ইউরোপের প্রধান অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ইতালির এই পিছিয়ে পড়ার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জার্মানিতে একজন মানুষের প্রত্যাশিত কর্মজীবন গড়ে ৪০ বছর। ফ্রান্স এবং স্পেনেও এই হার ইতালির চেয়ে অনেক বেশি। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে নেদারল্যান্ডস। সেখানে একজন নাগরিক গড়ে ৪৪ বছর কাজ করেন, যা ইতালির তুলনায় ১১ বছর বেশি।

উদ্বেগজনক লিঙ্গ বৈষম্য
প্রতিবেদনের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটি হলো নারী ও পুরুষের কর্মজীবনের ব্যাপক ব্যবধান। ইতালীয় নারীদের প্রত্যাশিত কর্মজীবন গড়ে মাত্র ২৮ বছর, যেখানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে নারীদের কর্মজীবনের গড় সময় ৩৫ বছর। এর ফলে ইতালিতে নারী ও পুরুষের কর্মজীবনের সময়ের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ বছরে, যা সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সর্বোচ্চ।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ইতালিতে নারী কর্মসংস্থানের হার মাত্র ৬০ শতাংশে থমকে আছে। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় নারী কর্মসংস্থানের হারের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কম। শ্রমবাজারে নারীদের এই অনগ্রসরতা এবং কর্মক্ষেত্রে তাদের অবস্থানের স্বল্পস্থায়ীত্ব ইতালির জাতীয় উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের ওপর প্রভাব
ইতালিতে বসবাসরত কয়েক লক্ষ বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মজীবীদের জন্য এই প্রতিবেদনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইতালীয় শ্রমবাজারের এই ধীরগতি এবং পেনশনের জন্য প্রয়োজনীয় বছর পূর্ণ করার চ্যালেঞ্জ প্রবাসী পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি নারীদের ইতালীয় শ্রমবাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে যে বিদ্যমান সামাজিক ও কাঠামোগত বাধা রয়েছে, তা দেশটির এই সামগ্রিক পরিস্থিতিরই প্রতিফলন।
ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইতালিতে কর্মজীবনের মেয়াদ কম হওয়ার অন্যতম কারণ হলো দেরিতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ এবং দ্রুত অবসর গ্রহণের প্রবণতা। সিএনএ-র এই প্রতিবেদনটি ইতালীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে হলে নারী ও তরুণদের কর্মসংস্থানে উৎসাহিত করা এবং শ্রমবাজারে তাদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছে সংস্থাটি। যদি এই ব্যবধান কমানো সম্ভব না হয়, তবে ভবিষ্যতে ইতালির সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশন ব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে পারে।
২০২৫ সালে ইতালিতে প্রত্যাশিত কর্মজীবন ছিল মাত্র ৩৩ বছর—ইউরোপীয় ইউনিয়নে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, যা ৩৭.৫ বছরের EU গড়ের চেয়ে ৪.৫ বছর কম।
tg24.sky


