ইতালিতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ২৫ প্রদেশে নতুন ‘ট্রানজিট জোন’ ঘোষণা: আশ্রয়ের আবেদন যাচাই হবে দ্রুতগতিতে

4 Min Read

ইতালি সরকার দেশটির ২৫টি প্রদেশে নতুন সীমান্ত এলাকা এবং ট্রানজিট জোন নির্ধারণ করে একটি বিশেষ ডিক্রি জারি করেছে, যার লক্ষ্য হলো আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।

ইতালিতে অভিবাসন ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministero dell’Interno)। গত ১০ আগস্ট ইতালির সরকারি গেজেটে (Gazzetta Ufficiale) ২১ জুলাই ২০২৬-এ স্বাক্ষরিত একটি নতুন ডিক্রি প্রকাশিত হয়েছে। এই ডিক্রির মাধ্যমে দেশটির ২৫টি প্রদেশে নতুন ‘বর্ডার জোন’ বা সীমান্ত এলাকা এবং ট্রানজিট পয়েন্টের ভৌগোলিক সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন ‘অ্যাসাইলাম অ্যান্ড মাইগ্রেশন প্যাক’ (New Pact on Migration and Asylum) বা নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে ইতালি সরকার।

আইনি মর্যাদা ও নতুন পদ্ধতি

নতুন এই ডিক্রির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন। ডিক্রি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট এই সীমান্ত বা ট্রানজিট জোনগুলোতে যখন কোনো অভিবাসী প্রবেশ করবেন বা তাদের নিয়ে আসা হবে, তখন প্রাথমিক স্ক্রিনিং ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলাকালীন তারা আইনত ইতালির মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছেন বলে গণ্য হবে না। ইতালীয় আইনে একে ‘নন আনকোরা এনত্রাতো’ (non ancora entrato) বা ‘এখনো প্রবেশ করেনি’ বলে অভিহিত করা হচ্ছে।

এই বিশেষ এলাকাগুলোতে অবস্থানরত অভিবাসীদের ক্ষেত্রে ‘প্রচেদুরা আচ্ছেলেরাতা’ (procedura accelerata) বা দ্রুততর প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন বা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনগুলো অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে যাচাই করা সম্ভব হবে। যদি কারো আবেদন নাকচ হয়, তবে তাকে ওই ট্রানজিট পয়েন্ট থেকেই সরাসরি নিজ দেশে ফেরত পাঠানো বা পুশব্যাকের (respingimento) প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে।

চিহ্নিত ২৫টি প্রদেশ

ইতালি সরকার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বন্দর, বিমানবন্দর এবং স্থল সীমান্ত সংলগ্ন ২৫টি প্রদেশকে এই নতুন তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রদেশগুলো হলো:
আস্তি (Asti), বেল্লুনো (Belluno), বেনেভেন্তো (Benevento), বোলোনিয়া (Bologna), ফেররারা (Ferrara), জেনোভা (Genova), ইম্পেরিয়া (Imperia), লা স্পেসিয়া (La Spezia), লাতিনা (Latina), লেক্কো (Lecco), মানতোভা (Mantova), মিলানো (Milano), মোনজা ব্রিয়ানজা (Monza Brianza), পাদোভা (Padova), পর্ডেনোনে (Pordenone), রেজ্জো কালাব্রিয়া (Reggio Calabria), সাভোনা (Savona), সিয়েনা (Siena), ট্রেভিজো (Treviso), উদিনে (Udine), ভারেজে (Varese), ভেনিস (Venezia), ভেরোনা (Verona), ভিবো ভ্যালেন্তিয়া (Vibo Valentia) এবং ভিচেনজা (Vicenza)।

প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রেক্ষাপট

এই ডিক্রি জারির মাধ্যমে ওই এলাকাগুলোতে পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তারা সরাসরি অভিবাসন সংক্রান্ত প্রশাসনিক নিয়মাবলী এবং সীমান্ত পরিচালনা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে পারবেন। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমান অভিবাসন প্রবাহের গতিপ্রকৃতি বিবেচনা করে এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করতেই এই মানচিত্র সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

বিশেষ করে মিলানো, ভেনিস বা বোলোনিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে এই নিয়ম কার্যকর হওয়ায় অভিবাসীদের স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর হবে। এর আগে অভিবাসীরা ইতালিতে প্রবেশের পর দীর্ঘ সময় ধরে আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ পেতেন, যা এখন এই ২৫টি প্রদেশের ক্ষেত্রে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে আসবে।

অভিবাসীদের ওপর প্রভাব

এই নতুন নিয়ম ইতালিতে আশ্রয়ের সন্ধানে আসা ব্যক্তিদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা অনিয়মিত অভিবাসীরা যারা এই ২৫টি প্রদেশের বন্দর বা বিমানবন্দর দিয়ে প্রবেশ করবেন, তারা আর সরাসরি ইতালির মূল ভূখণ্ডের আইনি অধিকার পাবেন না যতক্ষণ না তাদের প্রাথমিক স্ক্রিনিং শেষ হচ্ছে। দ্রুততম প্রক্রিয়ায় আবেদন যাচাইয়ের ফলে অযোগ্য আবেদনকারীদের কয়েক দিনের মধ্যেই নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পথ প্রশস্ত হলো। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই ‘ফাস্ট ট্র্যাক’ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও ইতালি সরকার এটিকে সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবৈধ অভিবাসন রোধে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখছে। পরবর্তী ধাপে এই কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামো বৃদ্ধির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রশাসনের।

মূল বিষয় হলো, ইতালিতে সীমান্ত ও ট্রানজিট এলাকার পরিধি বাড়ানো হয়েছে, যেখানে অভিবাসন ও আশ্রয় আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের জন্য বিশেষ সীমান্ত প্রক্রিয়া কার্যকর হবে।

integrazionemigranti.gov

Share This Article