ইতালির মেস্ত্রের স্কুলে অভূতপূর্ব চিত্র: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একচেটিয়া উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠান ছাড়ছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী ও কর্মীরা

3 Min Read

ভাষাগত জটিলতা ও সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারীর সংকটে মেস্ত্রের একটি বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে; নতুন দায়িত্ব নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন প্রধান শিক্ষিকা।

ইতালির ভেনিস সংলগ্ন মেস্ত্রে (Mestre) শহরের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। স্থানীয় ‘কাইয়ো জুলিয়ো চেজারে’ সমন্বিত বিদ্যালয় বা ইনস্টিটিউটে (Istituto Comprensivo Caio Giulio Cesare) ইতালীয় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে এবং পুরো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এখন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দখল করেছে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীরা। কেবল স্থানীয় বা অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীই নয়, ভাষাগত দূরত্ব ও সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারীর (Mediatore culturale) অভাবে বিদ্যালয়টি ছেড়ে চলে গেছেন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সাধারণ সহায়ক কর্মচারীরাও।

প্রতিষ্ঠানটির নথি অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত প্রাক-প্রাথমিক শাখার (Scuola dell’infanzia) দুটি ক্যাম্পাসে বর্তমানে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থীর নামের সাথে ইতালীয় পারিবারিক পদবি রয়েছে। অন্যদিকে, মাধ্যমিক পর্যায়ের (Scuola media) ছয়টি শ্রেণিতে সব মিলিয়ে মাত্র দশজনের মতো স্থানীয় ইতালীয় শিক্ষার্থী অবশিষ্ট রয়েছে। অন্যান্য বিদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও এখানে একেবারেই নগণ্য; ফলে পুরো বিদ্যাপীঠে এখন প্রায় এককভাবে অবস্থান করছে বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের সন্তানরা। তবে বেশিরভাগ বাংলাদেশি অভিভাবক ইতালীয় ভাষায় কথা বলতে না পারায় এবং যোগাযোগের জন্য কোনো দোভাষী বা মধ্যস্থতাকারী না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে নিয়মিত যোগাযোগে মারাত্মক জটিলতা দেখা দিচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক বিভাগেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সহায়ক ও দাপ্তরিক কর্মীদের (Personale ATA) বড় অংশই ছিলেন অস্থায়ী চুক্তির আওতায়। নিয়ম অনুযায়ী বার্ষিক চুক্তির মেয়াদ শেষে পুরনো কর্মচারীদের প্রায় সবাই অন্য স্কুলে বদলি হয়ে গেছেন এবং আঞ্চলিক পর্যায় থেকেও নতুন কোনো স্থায়ী কর্মী এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখাননি। ফলে সাধারণ ও প্রশাসনিক সেবা বিষয়ক পরিচালক বা ডিএসজিএ (DSGA) ছাড়া পুরো কার্যালয় কার্যতই কর্মীশূন্য হয়ে পড়েছিল। গত ১ সেপ্টেম্বর তেরামো (Teramo) শহর থেকে বদলি হয়ে প্রতিষ্ঠানটিতে নতুন প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন আন্তোনেল্লা জুক্কারিনি (Antonella Zuccarini)। প্রথমবার কোনো প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব নেওয়া এই কর্মকর্তা দ্রুত অস্থায়ী কর্মী তলব করে দাপ্তরিক কার্যক্রম পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

মেস্ত্রের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এমন কেন্দ্রীভূত উপস্থিতির পেছনে মূলত কর্মসংস্থান ও আবাসনের সুবিধা কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির আওতাধীন দুটি কিন্ডারগার্টেন, দুটি প্রাথমিক ও একটি মাধ্যমিক শাখা মেস্ত্রে রেলওয়ে স্টেশন ও মারঘেরা (Marghera) এলাকার সংলগ্ন স্থানে অবস্থিত। এই অঞ্চলগুলোতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ নিকটবর্তী জাহাজ নির্মাণ শিল্প কারখানা (Cantieri) কিংবা শহরের কেন্দ্রস্থলের রেস্তোরাঁগুলোতে কর্মরত। কর্মস্থলের নৈকট্য এবং সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়ার সহজ যাতায়াত ব্যবস্থার কারণেই তারা সন্তানদের এই নির্দিষ্ট বিদ্যালয়ে পাঠাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

নতুন প্রধান শিক্ষিকা আন্তোনেল্লা জুক্কারিনি পুরো পরিস্থিতিকে একটি ‘বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং একটি টেকসই ও কার্যকর শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করতে সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ সাংস্কৃতিক মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ এবং অভিভাবকদের জন্য ভাষা সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এই বহুসাংস্কৃতিক শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।


ভেনিসের মেস্ত্রের একটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের প্রায় সবাই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত; ইতালীয় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ভাষাগত যোগাযোগের সমস্যায় স্কুলের কর্মীরাও চলে গেছেন, নতুন প্রধান শিক্ষকের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

tgcom24.mediaset

Share This Article