ইতালির বোলজানোয় ভ্যানের চাপায় প্রাণ হারানো তিন বছর বয়সী শিশু জামিলা খাতুনের শেষকৃত্যের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছে স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি; ঘাতক চালকের বিরুদ্ধে চলছে আইনি প্রক্রিয়া।
ইতালির উত্তরাঞ্চলীয় বোলজানো শহরে একটি পণ্যবাহী ভ্যানের ধাক্কায় নিহত তিন বছর বয়সী বাংলাদেশি শিশু জামিলা খাতুনের মরদেহ শেষকৃত্যের উদ্দেশ্যে দেশে পাঠানো হয়েছে। গত ২ অক্টোবর সকালে মিলান বিমানবন্দর থেকে শিশুটির মরদেহ নিয়ে একটি ফ্লাইট বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দেয়। এর ঠিক একদিন আগে সন্তানহারা বাবা জাকির হোসেন ও মা সায়রা খাতুন দাফনের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে দেশে পৌঁছান। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় বোলজানোর অভিবাসী সমাজে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শোকগ্রস্ত পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে মরদেহ পরিবহন ও শোকাহত মা-বাবার যাতায়াতের খরচ মেটাতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার ইউরো আর্থিক সহায়তা সংগ্রহ করেছেন স্থানীয় প্রবাসীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত মঙ্গলবার সকাল দশটার কিছু পরে বোলজানোর গারিবালদি সড়কে ওয়ালথারপার্ক সংলগ্ন ফুটপাতে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। সে সময় মা সায়রা খাতুনের সঙ্গে ভিলপিয়ানো যাওয়ার উদ্দেশে ২০১ নম্বর বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট জামিলা। শিশুটির বাবা ভিলপিয়ানোতে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। ঠিক ওই মুহূর্তে একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে মালামাল নামিয়ে ৪৩ বছর বয়সী এক স্থানীয় চালকের ফিয়াট ডুকাটো ভ্যানটি চলতে শুরু করলে জামিলা তার নিচে চাপা পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই শিশুটির মৃত্যু হয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ঘাতক ভ্যানটি জব্দ করেছে এবং চালকের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত সড়ক হত্যার (omicidio stradale) অভিযোগে মামলা দায়ের করে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।

মিলান থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল হয়ে বিমানযোগে জামিলার মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এবং পরবর্তীতে সড়কপথে পরিবারের আদি নিবাস যশোর জেলায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই দীর্ঘ যাত্রার ব্যয় নির্বাহে স্থানীয় আলতো আদিজে প্রবাসী বাংলাদেশি সম্প্রদায় আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে। তারা দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে ৫ হাজার ৫০০ ইউরো সংগ্রহ করে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৫০০ ইউরো মরদেহ পরিবহন এবং বাকি ২ হাজার ইউরো পিতা-মাতার জরুরি বিমান টিকিটের জন্য প্রদান করা হয়। মরদেহ পাঠানোর আগে বোলজানো হাসপাতালের মর্গে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী শিশুটির জানাজা সম্পন্ন হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, যশোরে জামিলার এক বড় ভাই এবং দুই বছর বয়সী এক ছোট বোন রয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে জামিলার মা যখন ইতালিতে পাড়ি জমান, তখন ভিসা জটিলতার কারণে ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারেননি। তবে আগামী নভেম্বরের শেষের দিকে, অর্থাৎ প্রায় ৫০ দিন পর যখন এই দম্পতি ইতালি ফিরে আসবেন, তখন তাঁরা ছোট মেয়েকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন। আলতো আদিজে বাংলাদেশি কমিউনিটির সভাপতি শাহি শাহিনুরজামান জানান, এই দুঃসহ শোকের মুহূর্তে মাতৃহৃদয়ের পক্ষে কোলের সন্তানকে আর দূরে রাখা সম্ভব নয় বলেই তাঁরা এবার ফেরার সময় ছোট মেয়েকে ইতালি নিয়ে আসার ব্যবস্থা করছেন।
এদিকে দুর্ঘটনার পর থেকেই গারিবালদি সড়কের বাস স্টপেজের ডিজিটাল বোর্ডটির নিচে ফুল, নানা রঙের খেলনা ও পুতুল রেখে জামিলার প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। দুর্ঘটনার স্থানটি বেশ প্রশস্ত হওয়ায় সেটিকে শিশু জামিলার স্মৃতি চত্বর হিসেবে নামকরণের জন্য নগর প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছে স্থানীয় প্রবাসী সম্প্রদায়। অন্যদিকে পরিবারের নবনিযুক্ত আইনজীবী নিকোলা নেতিস জানিয়েছেন, জামিলার পরিবার ইতালির বিচার বিভাগের ওপর গভীর আস্থা রাখছে এবং তারা ন্যায়বিচারের স্বার্থে তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
২ অক্টোবর ২০২৬, তিন বছরের জামিলার মরদেহ বাংলাদেশে নেওয়া হয়; পরিবারের জন্য ৫,৫০০ ইউরো সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশি সম্প্রদায়। দুর্ঘটনার ঘটনায় ফুর্গন জব্দ, চালক সড়ক হত্যার অভিযোগে তদন্তাধীন।
altoadige


