ইউরোপে অভিবাসন সংকট মোকাবিলা এবং আন্তঃসীমান্ত চলাচল নিয়ে ইতালি ও স্পেনের মধ্যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সিউটাতে (Ceuta) সম্প্রতি উদ্ভূত শরণার্থী পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সরকারের মধ্যে বাগযুদ্ধ এখন তুঙ্গে।
রোম-মাদ্রিদ দ্বৈরথ ও স্পেনের কঠোর সমালোচনা
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেজ সম্প্রতি একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ইতালির জর্জিয়া মেলোনি সরকারকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তিনি মেলোনি সরকারকে অভিবাসন সংকট সামলাতে ‘অযোগ্য’ এবং ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করেন। আলবারেজ দাবি করেন, স্পেন যেভাবে সিউটা সংকট দ্রুত সমাধান করতে পেরেছে, ইতালির সরকারও হয়তো চাইত ল্যাম্পেডুসা দ্বীপের সংকট একইভাবে সমাধান করতে। কিন্তু মেলোনি সরকার সেই সক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, ইতালির বর্তমান অবস্থান ইউরোপীয় সংহতির পরিপন্থী এবং যারা এই সংহতি মানে না, তারা আসলে ইউরোপেরই ক্ষতি করছে।
শেনজেন চুক্তি ও ইতালির পাল্টা ব্যবস্থা
এই বিতর্কের মূলে রয়েছে ইতালি ও ডেনমার্কের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব। সিউটা দিয়ে মরক্কো থেকে কয়েক হাজার অভিবাসী প্রবেশের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর, ইতালি ও ডেনমার্ক স্পেনকে ইউরোপের শেনজেন (Schengen) এলাকা থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করার দাবি তোলে। যদিও ইউরোপীয় আইন অনুযায়ী এমন পদক্ষেপ প্রায় অসম্ভব, তবুও ইতালি সরকার এক মাসের জন্য স্পেন থেকে আসা নন-ইউরোপীয় নাগরিকদের ওপর বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোতে বিশেষ তল্লাশি শুরু করেছে। ইতালি এই পদক্ষেপকে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় জরুরি বলে বর্ণনা করেছে।
সিউটা সংকট বনাম ল্যাম্পেডুসা: পরিসংখ্যানের লড়াই
স্পেনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সিউটা দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী প্রবেশের চেষ্টা করলেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৪৮ হাজার মানুষকে মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিপরীতে, ইতালির বিরোধী দলগুলো মেলোনি সরকারের তীব্র সমালোচনা করছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ফাইভ স্টার মুভমেন্টের নেতা জুসেপ্পে কন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে ‘নৌ-অবরোধ’ (Naval Blockade) করার কথা থাকলেও মেলোনির শাসনামলে ৩ লক্ষ ২০ হাজারেরও বেশি অভিবাসী ইতালিতে প্রবেশ করেছে। কন্তের মতে, যেখানে স্পেন দুই দিনে প্রায় সবাইকে ফেরত পাঠাতে পারে, সেখানে মেলোনি সরকার কেবল শেনজেন বাতিলের মতো অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা দিয়ে সময় নষ্ট করছে।
তবে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Viminale) এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে ইতালিতে অবৈধ অভিবাসী প্রবেশের হার গত বছরের তুলনায় ৫৫ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের তুলনায় ৮২ শতাংশ কমেছে। বর্তমানে ল্যাম্পেডুসা দ্বীপে মাত্র ৯৮ জন অভিবাসী রয়েছেন এবং সেখানে কোনো জরুরি অবস্থা নেই বলেও মন্ত্রণালয় দাবি করেছে।

ইউরোপীয় কমিশনের অবস্থান ও নিরাপত্তা উদ্বেগ
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন একটি সাধারণ ইউরোপীয় সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বহিঃসীমান্ত সুরক্ষায় কঠোর নজরদারি এবং প্রয়োজনে ‘ভৌত প্রাচীর’ বা ফিজিক্যাল ব্যারিয়ার তৈরির সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সীমান্ত রক্ষা করা সদস্য রাষ্ট্রগুলোর একটি সম্মিলিত দায়িত্ব।
আইনি জটিলতা ও মানবিক বিপর্যয়
স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি সাম্প্রতিক রায় এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। আদালত জানিয়েছে, সমুদ্রপথে অননুমোদিতভাবে প্রবেশকারীদের পরিচয় নিশ্চিত না করে এবং তাদের সুরক্ষার আবেদন করার সুযোগ না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। অন্যদিকে, মানবপাচারকারী চক্রগুলো এই রায়কে অভিবাসীদের জন্য একটি ‘সুযোগ’ হিসেবে প্রচার করছে। এই উত্তেজনার মাঝে সিউটা সীমান্তে অন্তত ৭২ থেকে ৮৮ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদিও মরক্কো সরকার মাত্র ১১ জনের মৃত্যুর খবর স্বীকার করেছে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
ইতালির পার্লামেন্টেও এই ইস্যুতে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বিরোধী দলগুলো প্রধানমন্ত্রী মেলোনির কাছ থেকে এই কূটনৈতিক টানাপড়েন নিয়ে ব্যাখ্যা দাবি করেছে। বিরোধী নেতা নিকোলা ফ্রাতোইয়ান্নি সরকারের শেনজেন বন্ধের সিদ্ধান্তকে ‘অর্থহীন ও নিষ্ঠুর রাজনৈতিক চাল’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, কন্তে অভিযোগ করেছেন যে, স্পেন যখন নিজের সীমান্তে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে, তখন ইতালীয় সরকার কেবল লোকদেখানো পাসপোর্ট তল্লাশি করে নিরাপত্তা কর্মীদের কাজের চাপ বাড়াচ্ছে।
স্পেনের দাবি, সিউটা সংকটেও অধিকাংশ অনুপ্রবেশকারীকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মরক্কোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে; তবুও অভিবাসন ইস্যুতে ইতালির অবস্থানকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে কড়া সমালোচনা করেছে মাদ্রিদ।
corriere


