রোমে ক্লাসরুমে শিক্ষিকাকে ছুরিকাঘাত ও লাইভ করার চেষ্টা ১৩ বছরের ছাত্রের: প্রাণে বাঁচালেন সহপাঠী

5 Min Read

খারাপ ফলের জেরে পরীক্ষা এড়াতে সুপরিকল্পিতভাবে শিক্ষিকার ওপর হামলা চালায় অপ্রাপ্তবয়স্ক এক শিক্ষার্থী; তবে কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত অপর এক সহপাঠীর তাৎক্ষণিক প্রতিরোধে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন তিনি।

ইতালির রাজধানী রোমের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিজ শিক্ষিকাকে ক্লাসরুমের ভেতরে ধারালো ছুরি দিয়ে আঘাত করার পাশাপাশি পুরো ঘটনার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের (লাইভ স্ট্রিমিং) চেষ্টার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সেন্তোচেল্লে (Centocelle) এলাকার ‘জিওভান্নি ভেরগা’ (Giovanni Verga) বিদ্যালয়ে ১৩ বছর বয়সী এক ছাত্রের হাতে হামলার শিকার হন তার সাহিত্যের শিক্ষিকা ইসাবেলা মারসিলিও (Isabella Marsilio)। তবে শ্রেণিকক্ষে থাকা আফ্রিকান দেশ কঙ্গো বংশোদ্ভূত আরেক শিক্ষার্থীর তাৎক্ষণিক সাহসিকতায় আরও বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন ওই শিক্ষিকা।

পুলিশ ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লাসে আসে অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্র। ক্লাসে প্রবেশের আগে সে বিদ্যালয়ের শৌচাগারে গিয়ে নিজের স্কুলব্যাগ থেকে ২০ সেন্টিমিটার দীর্ঘ ফলার দুটি ধারালো ছুরি বের করে এবং মাথায় পরিহিত হেলমেটে যুক্ত ক্যামেরার মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি লাইভ সম্প্রচার চালু করে। এরপর সবার শেষে ক্লাসরুমে ঢুকে কোনো কথা না বলেই সোজা শিক্ষিকার দিকে এগিয়ে যায়। প্রথমে শিক্ষিকার মুখে তীব্র ঝাঁঝালো মরিচের গুঁড়োর স্প্রে (পিপার স্প্রে) ছিটিয়ে দৃষ্টিশক্তি ব্যাহত করে এবং মুহূর্তের মধ্যেই তার পাঁজরে একের পর এক তিনটি আঘাত হানে। ওই সময় শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত কঙ্গোলিজ বংশোদ্ভূত আরেক ছাত্র দ্রুত এগিয়ে এসে আক্রমণকারীকে শক্তভাবে জাপটে ধরে এবং তার হাত থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়।

হামলায় গুরুতর আহত ৬৬ বছর বয়সী প্রবীণ শিক্ষিকা ইসাবেলাকে তাৎক্ষণিকভাবে রোমের ভান্নিনি (Vannini) হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়। চার দশকেরও বেশি সময় শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত এই শিক্ষিকার চলতি শিক্ষাবর্ষ শেষেই অবসরে যাওয়ার কথা ছিল। শরীরের একপাশে গভীর ক্ষত তৈরি হলেও সৌভাগ্যবশত কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বিকেলে তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আক্রমণকারী ছাত্রের প্রতি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ না করে তিনি বলেন, “আঘাত করার পুরো সময়টা ছেলেটি সম্পূর্ণ নির্বাক ছিল। আমি এখনও ছেলেটিকে ভালোবাসি এবং পারলে তাকে একবার বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই। আমার পড়াশোনার কড়াকড়িকে সে যদি কোনো শাস্তি বা নিপীড়ন মনে করে থাকে, তবে তা আমার শিক্ষকতা জীবনের চরম ব্যর্থতা।” তবে এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ওই শিক্ষিকার স্বামী বলেন, “আমি আশা করব পুলিশ যেন অবিলম্বে ওই ছাত্র ও তার অসচেতন মা-বাবাকে কারাগারে পাঠায়।”

তদন্তকারী সামরিক পুলিশ কারাবিনিয়ারির (Carabinieri) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষাগত ঘাটতি (debito formativo) পুষিয়ে নেওয়ার জন্য ঘটনার দিনই ওই ছাত্রের একটি বিশেষ পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। ওই পরীক্ষা ও শিক্ষিকার কড়াকড়ির প্রতি ক্ষোভ থেকেই বেশ কিছুদিন ধরে সে হামলার ছক কষে। ইন্টারনেট থেকে ছুরি ও ক্যামেরা সংগ্রহের পাশাপাশি টিকটকে একটি গ্রুপ খুলে সে ঘটনার আগের রাত থেকে হামলার জন্য উল্টো গণনা (কাউন্টডাউন) শুরু করে। তবে ইতালীয় আইন অনুযায়ী ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের ফৌজদারি অপরাধের আওতায় বিচার করার বিধান না থাকায় (non imputabile) তাকে সরাসরি গ্রেপ্তার দেখানো যায়নি। জব্দকৃত মুঠোফোনের ফরেনসিক তদন্তের পাশাপাশি পুরো ঘটনার আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন রোমের অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিশেষ আদালতে (Procura dei Minori) জমা দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, আক্রান্ত শিক্ষিকার ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূর্বে প্রকাশিত অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক বক্তব্য ও অভিবাসী প্রত্যাবাসনের সমর্থনমূলক কিছু পোস্ট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে উদ্ধারকারী ছাত্রের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ওই শিক্ষিকা স্পষ্ট জানান, তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চিন্তাভাবনার সঙ্গে নিজের জীবন রক্ষাকারী কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের কোনো বিরোধ নেই। এ ঘটনার পর পুরো ইতালি জুড়ে শিক্ষাব্যবস্থায় সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। দেশটির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা (Giuseppe Valditara) ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের তাগিদ দিয়েছেন। এছাড়া রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি এবং বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান এলি শ্লাইনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট চিহ্নিত করতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন।


১৩ বছরের এক কিশোর রোমের স্কুলে শিক্ষিকাকে ছুরি ও মরিচের স্প্রে দিয়ে হামলা করে; সহপাঠীর হস্তক্ষেপে প্রাণে বাঁচেন শিক্ষক, পরে অভিযুক্ত কিশোরকে আটক করে পুলিশ।

ansa

Share This Article