ডাবলিন রেগুলেশন প্রয়োগ নিয়ে দুই ইউরোপীয় শক্তির মধ্যে বাড়ছে দূরত্ব; শেনজেন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার শঙ্কায় অর্থনীতিবিদ ও ইইউ নীতিনির্ধারকরা।
ইউরোপে অভিবাসন ইস্যু নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে জার্মানি এবং ইতালির মধ্যে। বার্লিন সরকার ঘোষণা করেছে যে তারা ‘ডাবলিন রেগুলেশন’ (Dublin Regulation) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন চুক্তির অধীনে অভিবাসীদের আবারও ইতালিতে ফেরত পাঠাবে। তবে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ভিমিনালে (Viminale) এই দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে যে, বর্তমানে জার্মানি থেকে কোনো অভিবাসীকে গ্রহণ করার দায়বদ্ধতা ইতালির নেই। এই পরিস্থিতি কেবল দুই দেশের সম্পর্কই নয়, বরং পুরো ইউরোপের মুক্ত চলাচল ব্যবস্থা বা শেনজেন (Schengen) চুক্তির ভবিষ্যৎকেও হুমকির মুখে ফেলেছে।
জার্মানির কঠোর অবস্থান ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শোলৎজের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং বিরোধী দলীয় নেতা ফ্রেডরিক মার্জ অভিবাসন ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। বিশেষ করে আগামী ৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট (Sassonia-Anhalt) রাজ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে এই তোড়জোড় শুরু হয়েছে। সেখানে উগ্র ডানপন্থী দল এএফডি (AfD) জনমতে এগিয়ে থাকায় অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে বার্লিন।
জার্মান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন যে, গত ১২ জুন থেকে কার্যকর হওয়া নতুন ইউরোপীয় অভিবাসন চুক্তির অধীনে তারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করবে। এর একটি প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আবদিলরিসাক ওয়ারসেম নামক এক ২২ বছর বয়সী সোমালি তরুণীর ঘটনাকে। গত মার্চে ইতালি হয়ে জার্মানিতে প্রবেশ করা এই তরুণীকে আগামী ১৯ আগস্ট পুলিশি পাহারায় ইতালিতে ফেরত পাঠানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
ইতালির সরাসরি প্রত্যাখ্যান ও ‘ক্ষতিপূরণ’ যুক্তি
জার্মানির এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, ১২ জুন ২০২৬-এর আগে যারা ইউরোপে প্রবেশ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে জার্মানির সাথে ইতালির বিশেষ দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা রয়েছে। সেই অনুযায়ী ওই অভিবাসীদের গ্রহণ করতে ইতালি বাধ্য নয়। এছাড়া ইতালির দাবি, এই অল্প সময়ের মধ্যে ইতালিতে অবতরণ করে অন্য দেশে চলে যাওয়ার সংখ্যা এখনো নিশ্চিত করার মতো সময় অতিবাহিত হয়নি।
ইতালি আরও একটি জোরালো যুক্তি সামনে এনেছে। রোম জানিয়েছে, জার্মানির পতাকাবাহী বিভিন্ন এনজিও (NGO) জাহাজ ভূমধ্যসাগর থেকে অভিবাসীদের উদ্ধার করে ইতালীয় উপকূলে নিয়ে আসে। ফলে ইতালি যদি জার্মানি থেকে অভিবাসীদের ফেরত নেয়, তবে জার্মানিকেও ইতালিতে নামানো ওই অভিবাসীদের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে ‘ক্ষতিপূরণ’ দিতে হবে।

ইউরোপীয় কমিশনের পর্যবেক্ষণ ও আইনি দিক
ব্রাসেলস ভিত্তিক ইউরোপীয় কমিশন গত ১৫ জুলাই এক মূল্যায়নে জানিয়েছে যে, নতুন চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে ইতালি বেশ কিছু নিয়ম পালনে ব্যর্থ হয়েছে। জার্মানি ও ফ্রান্সসহ আটটি সদস্য দেশ ইতালিকে অভিবাসী ফেরত নেওয়ার জন্য অনুরোধ পাঠালেও রোম অন্তত ১২টি ক্ষেত্রে তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। ইউরোপীয় আইনের অধীনে, একটি দেশ অন্য দেশের অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারে না, বরং তাকে বিকল্প একটি তারিখ প্রস্তাব করতে হয়।
শেনজেন ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির আশঙ্কা
এই টানাপোড়েন কেবল অভিবাসীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর ফলে শেনজেন চুক্তির অধীনে মুক্ত চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপীয় সীমান্তে যদি পুনরায় তল্লাশি ও কড়াকড়ি শুরু হয়, তবে ইউরোপের অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হবে। বিশেষ করে ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ (Just-in-time) উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল সরবরাহে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে।
এছাড়া প্রতিদিন অন্তত ১৫ লাখ মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে কাজ করতে যাতায়াত করেন, যার মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার ইতালীয় নাগরিক। সীমান্ত কড়াকড়ি হলে তাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হবে এবং উৎপাদনশীলতা কমবে। পর্যটন খাতের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুলিশের প্রতি চরম আক্রমণাত্মক ও অপমানজনক মন্তব্যের জোয়ার শুরু হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আংশিক ও ভুল তথ্যের ভিত্তিতে অনেক ব্যবহারকারী কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করছেন। এই মন্তব্যের তীব্রতা বিচার করে যারা মাত্রাতিরিক্ত আক্রমণাত্মক আচরণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ।
অবশেষে নিজেদের স্বপ্নের মোটরিনো বা মপেড হাতে পেতে যাওয়া কিশোরদের পরিবারগুলো অত্যন্ত আনন্দিত। তারা ঘোষণা দিয়েছে যে, যারা তাদের এই দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছে এবং সংহতি প্রকাশ করেছে, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে একটি বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি নাগরিক এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য এই ঘটনাটি পরিশ্রম ও সততার মাধ্যমে স্বপ্ন জয়ের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জার্মানি ১৯ আগস্ট থেকে নতুন ইইউ আশ্রয়নীতি অনুযায়ী ইতালি হয়ে আসা অভিবাসীদের ফেরত পাঠাবে; রোম বলছে, ১২ জুনের আগে আসা ‘ডাবলিনান্তি’ ফেরত নেওয়ার প্রশ্নই নেই।
ansa


