কৃষি ও প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ‘গ্রিন টেক ল্যাব’ উদ্ভাবন করে আন্তর্জাতিক স্টেম অলিম্পিয়াডের জাতীয় পর্বে রৌপ্যপদক অর্জন করেছেন এই তরুণ; আগামী নভেম্বরে অংশ নেবেন রোমের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে।
শৈশবে নষ্ট রেডিও আর ক্যাসেট প্লেয়ার খুলে ছোট ছোট মোটর সংগ্রহ করতেন তিনি। এরপর কর্কশিট কেটে নিজ হাতে বানিয়ে নিতেন খেলনা জাহাজ আর গাড়ি। প্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগবঞ্চিত উপকূলীয় জনপদ সন্দ্বীপে বেড়ে ওঠা সেই কিশোর নিজের অদম্য কৌতূহল ও প্রচেষ্টায় আজ পৌঁছে গেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। উদ্ভাবনী রোবোটিকস প্রকল্প নিয়ে আগামী নভেম্বরে ইতালির রাজধানী রোমে অনুষ্ঠিতব্য বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন তরুণ শিক্ষার্থী জিহাদ শাহরিয়ার।
শাহরিয়ার বর্তমানে ঢাকার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী। সম্প্রতি রাজধানীতে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘ফিবোনাচ্চি আন্তর্জাতিক রোবট অ্যান্ড স্টেম অলিম্পিয়াড-২০২৬’-এর জাতীয় পর্বে অনন্য সাফল্য দেখিয়েছে তাঁর দল। গত ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতার ‘গ্রিন এন্টারপ্রেনিউরশিপ’ (পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা) বিভাগে রানার্সআপ হয়ে রৌপ্যপদক জিতে নেয় শাহরিয়ারের নেতৃত্বাধীন দল। নিয়মানুযায়ী এই আসরের শীর্ষ তিন পদকজয়ী দল আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেওয়ার গৌরব অর্জন করায় শাহরিয়ারদের সামনে ইতালির ‘ফিবোনাচ্চি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ’-এর দ্বার উন্মুক্ত হয়।
অলিম্পিয়াডে শাহরিয়ারের পাঁচ সদস্যের দল উপস্থাপন করে ‘গ্রিন টেক ল্যাব’ নামের একটি দূরদর্শী প্রকল্প মডেল। মাত্র এক মাসের নিবিড় প্রচেষ্টায় তৈরি এই উদ্যোগটিকে তাঁরা একটি ‘স্মার্ট গ্রিন লার্নিং ইনিশিয়েটিভ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো প্রকৃতি, কৃষি ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানো। মডেলটিতে উন্নত হাইড্রোপনিক পদ্ধতিতে মাটি ছাড়া উদ্ভিদ চাষের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সেন্সরের মাধ্যমে তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও পানির মান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়। পরবর্তীতে সংগৃহীত তথ্যগুলো ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ (আইওটি) প্রযুক্তির মাধ্যমে দূর থেকেই নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ সম্ভব। শাহরিয়ারের মতে, গ্রামীণ শিশুদের যেমন প্রযুক্তির ছোঁয়া পাওয়া জরুরি, তেমনি শহরের শিশুদেরও প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়া দরকার—এই ভাবনা থেকেই উদ্ভাবনটি তৈরি করা হয়েছে।

সন্দ্বীপ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডে শৈশব কাটানো শাহরিয়ারের প্রযুক্তির এই যাত্রা মোটেও মসৃণ ছিল না। ২০১৮ সালে সন্দ্বীপ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে মাধ্যমিক শেষ করে তিনি চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ইউআইইউতে ভর্তি হওয়ার পর ক্যাম্পাসের ‘মার্স রোভার টিম’-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে রোবোটিকস চর্চা শুরু করেন। সেখানে তিনি যন্ত্রের নকশা প্রণয়ন, ইলেকট্রনিকস, প্রোগ্রামিং, অটোমেশন, কম্পিউটার ভিশন ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার বিভিন্ন কৌশল আয়ত্ত করেন।
এ অর্জন প্রসঙ্গে ফিবোনাচ্চি অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ নাসির নিশ্চিত করেন যে, জাতীয় পর্বে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য জিহাদ শাহরিয়ারের দলকে রৌপ্যপদক দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণ, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জজয়ী দলগুলো আগামী নভেম্বরে রোমে আয়োজিত আন্তর্জাতিক মূল পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি নিয়ে জিহাদ শাহরিয়ার জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলের কোনো শিক্ষার্থীকে যেন রোবোটিকস শেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে না হয়, সেটাই তাঁর মূল লক্ষ্য। জন্মস্থান যেন কারও মেধা বিকাশের পথে অন্তরায় না হয়—এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার প্রত্যাশা জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান বা পৃষ্ঠপোষকের সহযোগিতা পেলে ইতালির বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকাকে মর্যাদার সাথে তুলে ধরতে চান তিনি।
সন্দ্বীপে রোবোটিকস শেখার সুযোগ না পেয়েও নষ্ট যন্ত্রপাতি দিয়ে শেখা জিহাদ শাহরিয়ার এবার রোবোটিকস প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে নভেম্বরে যাচ্ছেন ইতালির রোমে।
prothomalo


