ভূমধ্যসাগরে তেলের বিষাক্ত ধোঁয়ায় ৭ অভিবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু: উত্তাল সমুদ্রে রুদ্ধশ্বাস অভিযানে উদ্ধার অর্ধশত

4 Min Read

ইতালির উপকূলে পৌঁছানোর আগেই জরাজীর্ণ নৌকায় ভয়াবহ ট্র্যাজেডি; উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২৯ জনই নাবালক। সাগরে লিবীয় বাহিনীর বাধার মুখে ব্যাহত হচ্ছে এনজিওগুলোর উদ্ধার তৎপরতা।

ভূমধ্যসাগরের উত্তাল জলরাশিতে ইউরোপ অভিমুখে যাত্রাকালে আবারও এক মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ইতালির উপকূলের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া একটি ছোট জরাজীর্ণ নৌকায় তেলের বিষাক্ত ধোঁয়া ও ইঞ্জিনের বাষ্পে শ্বাসরোধ হয়ে সাতজন অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। গত কয়েক দিনের ব্যবধানে সাগরে এটি দ্বিতীয় বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা ‘ইমার্জেন্সি’ (Emergency)-এর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘লাইফ সাপোর্ট’ গত সপ্তাহে এই উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করে।

উদ্ধারকারীরা জানিয়েছেন, সাগরে ভাসমান ওই ছোট নৌকাটি (Barchino) অলৌকিকভাবে টিকে ছিল। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকাটির একপাশ বিপজ্জনকভাবে পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। উদ্ধারকারী দল যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন দেখা যায় নৌকাটি ডুবে যাওয়ার একেবারে শেষ পর্যায়ে। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে একে একে অভিবাসীদের উদ্ধারকারী নৌযানে স্থানান্তরিত করা হয়। তবে নৌকার ভেতর থেকে সাতজনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হলে পুরো উদ্ধার অভিযানে শোকের ছায়া নেমে আসে।

তদন্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, নৌকার নিচের ডেকে (Lower deck) থাকা অভিবাসীরাই মূলত এই ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছেন। নৌকার ইঞ্জিনের নির্গত ধোঁয়া এবং জ্বালানি তেলের তীব্র বাষ্পে সেখানকার বাতাস বিষাক্ত হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত অক্সিজেন না থাকায় এবং বের হওয়ার পথ অবরুদ্ধ থাকায় সাতজন অভিবাসী সেখানেই শ্বাসরোধ হয়ে মারা যান। এছাড়া আরও দুইজনকে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। লাইফ সাপোর্ট জাহাজের চিকিৎসা কর্মীরা তাদের জরুরি ভিত্তিতে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন।

এই অভিযানে মোট ৫০ জন অভিবাসীকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ জন পুরুষ এবং ৫ জন নারী রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ২৯ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালক। সুরক্ষা ও আশ্রয়ের সন্ধানে আসা এই মানুষগুলো নিজেদের মিশর ও সোমালিয়ার নাগরিক বলে পরিচয় দিয়েছেন। গুরুতর অসুস্থ দুই ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ইতালীয় কোস্টগার্ডের (Guardia Costiera) একটি বিশেষ টহল নৌযানে (Pilotina) স্থানান্তর করা হয়েছে।

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের এই সংকট দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ইমার্জেন্সি সংস্থার এই অভিযানের মাত্র পাঁচ দিন আগে ‘এসওএস মেডিটেরানি’ (SOS Mediterranee)-এর একটি নজরদারি বিমান মাঝ সমুদ্রে আরও ১১টি মরদেহ ভাসতে দেখেছিল। একই দিনে মাল্টার অনুসন্ধান ও উদ্ধার অঞ্চল (SAR zone) থেকে আরও ৫৫ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮ জন নারী এবং ৯ জন শিশু ছিল। ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ‘ফ্রন্টেক্স’ (Frontex)-এর একটি হেলিকপ্টার থেকে সংকেত পাওয়ার পর এই দ্বিতীয় উদ্ধার অভিযানটি চালানো হয়।

বর্তমানে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সাগরে এক নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। মানবিক সংস্থাগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে লিবীয় স্পিডবোট বা দ্রুতগামী নৌযানের উপস্থিতি সমুদ্রে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই লিবীয় বাহিনী প্রায়ই উদ্ধার অভিযানে বাধা প্রদান করছে এবং এনজিও কর্মীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। এই ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সাগরে উদ্ধারকাজ যেমন প্রলম্বিত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে অভিবাসীদের মৃত্যুঝুঁকি।

ইতালিতে বসবাসরত বিদেশি কমিউনিটি এবং অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য এই ঘটনাগুলো এক সতর্কবার্তা। সমুদ্রপথে ছোট নৌকায় যাতায়াত কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে, তা এই তেলের ধোঁয়ায় মৃত্যুর ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল। ইতালির প্রশাসন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি সাগরে নিয়মিত টহল ও সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছে।

ভূমধ্যসাগরে ডুবন্ত নৌকা থেকে ৫০ অভিবাসীকে উদ্ধার করা হলেও ৭ জনের মরদেহ মিলেছে; উদ্ধারকৃতদের ২৯ জনই নাবালক, যাদের অনেকে মিশর ও সোমালিয়ার নাগরিক।

ansa

Share This Article