ইউরোপমুখী অভিবাসীদের সার্বিক উপস্থিতি কমলেও সাগরে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে; এক যুগে তিনটি প্রধান নৌপথে প্রাণ হারিয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ।
ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানোর বিপজ্জনক যাত্রায় ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীদের মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সাম্প্রতিক এক বিশদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সমুদ্রপথে অভিবাসী পৌঁছানোর সংখ্যা হ্রাস পেলেও প্রাণহানির হার আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইউরোপের উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টাকালে অন্তত ১ হাজার ৯৭১ জন অভিবাসী ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ হয়েছেন অথবা তাঁদের সলিলসমাধি ঘটেছে। এই হিসাব যুক্ত হওয়ার পর গত ১২ বছরে ভূমধ্যসাগরের তিনটি প্রধান রুটে প্রাণ হারানো ও নিখোঁজ মানুষের সম্মিলিত সংখ্যা ৩৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
ইতালির অভিবাসন বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ফনদাৎসিওনে ইসমু’ (Fondazione ISMU ETS) আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতি বছর ৩ অক্টোবর পালিত ‘স্মৃতি ও অভ্যর্থনা দিবস’ (Giornata della Memoria e dell’Accoglienza) উপলক্ষে সংস্থাটি এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৩ অক্টোবর ইতালির ল্যাম্পেডুসা দ্বীপের কাছে একটি মর্মান্তিক নৌকাডুবিতে ৩৬৮ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক শোকাবহ ঘটনার স্মরণে দিবসটি পালিত হয়ে আসলেও সাগরে প্রাণহানির ধারাবাহিকতা এখনও বন্ধ হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ইতালি অভিমুখী মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুটটি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন পথ হিসেবে চিহ্নিত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই নৌপথে ইউরোপে অভিবাসী পৌঁছানোর হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৬ শতাংশ কমেছে। তবে আগমন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমলেও ঠিক একই সময়ে মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রাণহানির অর্ধেকেরও বেশি (প্রায় ৪৩০ জন) ঘটেছে জানুয়ারি মাসে, যখন ইতালি সংলগ্ন সিসিলি, সার্দিনিয়া ও কালাব্রিয়া অঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ‘হ্যারি’র বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে সাগরে একের পর এক ট্র্যাজেডি ঘটে।
একই ধরনের আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটেও। সেখানে উপকূলে পৌঁছানোর হার কম থাকা সত্ত্বেও গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের অদূরে একাধিক নৌকাডুবির কারণে অভিবাসীদের মৃত্যুর সংখ্যা তিনগুণে দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে, একমাত্র স্পেন অভিমুখী পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় রুটে অভিবাসীদের আগমনের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তর আফ্রিকার ছিটমহল সেউতা ও মেলিলায় স্থলসীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চাপ বাড়ার কারণে বছরের প্রথম চার মাসে স্পেনে আগমন প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত নথিবদ্ধ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছর ভূমধ্যসাগরে মোট মৃত্যুর প্রায় ৩১ শতাংশই ঘটেছে স্পেন ও ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জগামী এই পশ্চিম রুটে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সাগরে টহল বৃদ্ধির ফলে অভিবাসী আগমনের সংখ্যা কিছু ক্ষেত্রে কমে আসলেও পাচারকারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ আবহাওয়ায় অনিরাপদ নৌকা সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে। ফলে নিয়মিত নজরদারি সত্ত্বেও সমুদ্রে প্রাণহানির ঝুঁকি প্রতিনিয়ত চরম আকার ধারণ করছে।
২০২৬ সালে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপথে মৃত্যু ও নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ১,৯৭১-এ পৌঁছেছে; আগমন কমলেও মধ্য ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় রুটে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ansa


