ইতালির বেরগামোতে অপরাধী ও অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান: এক বাংলাদেশিসহ একাধিক বিদেশি বহিষ্কৃত

4 Min Read

যৌন নিপীড়ন, জালিয়াতি এবং জননিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বেরগামোর পুলিশ সদর দপ্তর একাধিক দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার ও প্রত্যাবাসন আদেশ কার্যকর করেছে।

ইতালির উত্তরের শহর বেরগামোতে (Bergamo) অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং নথিপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। গত ১১ এবং ১২ আগস্ট বিশেষ অভিযান চালিয়ে এক বাংলাদেশি নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিককে ইতালির ভূখণ্ড থেকে বহিষ্কার এবং নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের (Rimpatrio) আদেশ কার্যকর করেছে বেরগামোর পুলিশ সদর দপ্তর বা কুয়েস্তুরা (Questura)। জননিরাপত্তা রক্ষা এবং অনিয়মিত অভিবাসন রুখতে ইতালীয় সরকারের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

যৌন নিপীড়নের দায়ে বাংলাদেশি নাগরিক বহিষ্কৃত

বেরগামোর অভিবাসন বিভাগ (Ufficio Immigrazione) জানিয়েছে, বহিষ্কৃতদের মধ্যে একজন ৩৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। পুলিশি রেকর্ড অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুইজন তরুণীকে যৌন নিপীড়ন বা যৌন সহিংসতার (Violenza sessuale) গুরুতর অভিযোগ ছিল। ভুক্তভোগী নারীদের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত চালায় এবং ওই বাংলাদেশিকে জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ইতালিতে থাকার আইনগত যোগ্যতা হারানোর পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে আগেই বেরগামোর পুলিশ কমিশনার বা কুয়েস্তোরের (Questore) পক্ষ থেকে বিশেষ সতর্কতামূলক নিষেধাজ্ঞা জারি করা ছিল। সবশেষে তাকে আটক করে বহিষ্কারাদেশ দেওয়া হয় এবং একটি প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে (CPR – Centro per il rimpatrio) নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মরক্কান ও ফিলিপিনো নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

একই অভিযানে ইতালির রেলওয়ে পুলিশ বা পোলফার (Polfer) একজন মরক্কান নাগরিককে আটক করে। ওই ব্যক্তির অপরাধের তালিকা দীর্ঘ; তার বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, নারী উত্ত্যক্ত করা বা স্টকিং (Acts persecutory), এবং পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল। এমনকি তাকে ভুক্তভোগীদের কাছে না যাওয়ার জন্য আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা রেস্ট্রেইনিং অর্ডারও দেওয়া হয়েছিল। জননিরাপত্তার স্বার্থে তাকেও দ্রুত প্রত্যাবাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এছাড়া ১১ আগস্ট নাবালকদের প্রলুব্ধ করা বা অনলাইন গ্রুমিং (Adescamento di minorenni) এর দায়ে অভিযুক্ত একজন ফিলিপিনো নাগরিককে সরাসরি তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

দালমিনে পুলিশের যৌথ অভিযান ও মাসাজ সেন্টার তল্লাশি

১২ আগস্ট বেরগামোর দালমিন (Dalmine) এলাকায় পুলিশ সদর দপ্তর, আধাসামরিক বাহিনী কারাবিনিয়েরি (Carabinieri) এবং স্থানীয় পুলিশের সমন্বয়ে একটি বিশেষ চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল অনিয়মিতভাবে বসবাসকারী বিদেশিদের শনাক্ত করা।

অভিযান চলাকালীন পুলিশ দুইজন আলবেনীয় নারীকে আটক করে। তদন্তে দেখা যায়, তারা ইতালিতে থাকার বৈধ রেসিডেন্স পারমিট বা সোলা (Permesso di soggiorno) পাওয়ার জন্য বারবার মিথ্যা ও জাল নথিপত্র জমা দিচ্ছিলেন। কোনো আইনগত ভিত্তি না থাকায় এবং জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ায় বেরগামোর প্রিফেক্ট বা জেলা প্রশাসক (Prefetto) তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বহিষ্কারাদেশ জারি করেন এবং তাদের পুলিশি পাহারায় সরাসরি সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরবর্তীতে দালমিন এলাকার একটি মাসাজ সেন্টারে অতর্কিত পরিদর্শন চালায় পুলিশ। সেখানে কর্মরত তিনজন চীনা নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের মধ্যে একজনের কাছে বৈধ কোনো নথিপত্র বা পরিচয়পত্র ছিল না। তাকে বর্তমানে পুলিশি হেফাজতে রেখে তার আসল পরিচয় এবং ইতালিতে তার অবস্থানের বৈধতা যাচাই করা হচ্ছে।

অভিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য বার্তা

বেরগামো পুলিশের এই সাম্প্রতিক অভিযানটি স্থানীয় প্রবাসী বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ইতালির আইন অনুযায়ী, কোনো অভিবাসী যদি যৌন সহিংসতা, মাদক বা পারিবারিক সহিংসতার মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হন, তবে তার বৈধ নথিপত্র থাকলেও তা বাতিল করে তাকে বহিষ্কার করার সুযোগ রয়েছে। বেরগামোর কুয়েস্তুরা জানিয়েছে, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরাধ প্রবণতা কমিয়ে আনতে নিয়মিত বিরতিতে এ ধরনের তল্লাশি ও বহিষ্কার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে যে, যারা আইন মেনে চলছেন এবং নিয়মিতভাবে নথিপত্র নবায়ন করছেন তাদের ভয়ের কিছু নেই। তবে যারা জালিয়াতি বা অপরাধের সাথে যুক্ত, তাদের ব্যাপারে ইতালীয় সরকার এখন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে।

বেরগামোতে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানে একাধিক বিদেশি নাগরিককে বহিষ্কার ও দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা নেয় পুলিশ; অভিযানে অপরাধের রেকর্ড ও জাল কাগজপত্রও সামনে আসে।

bergamo.corriere

Share This Article