রিমিনির ইনফার্মি হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ইতালীয় আইনের বিশেষ সুযোগ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই এক যুগলের বিয়ের স্বপ্ন পূরণ করলেন চিকিৎসকরা।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ মানেই ছোটাছুটি, সাইরেনের শব্দ আর জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ লড়াই। কিন্তু গত ১৪ আগস্ট শুক্রবার সকালে ইতালির রিমিনি শহরের ইনফার্মি (Infermi) হাসপাতালের দৃশ্যপট ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেখানে শোক বা আতঙ্কের বদলে ছিল এক গভীর ভালোবাসার গল্প। এক যুগল তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করলেন হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (OBI – Osservazione Breve Intensiva) একটি কক্ষে।
আকস্মিক অসুস্থতা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত
রিমিনির বাসিন্দা এই দম্পতির পরিকল্পনা ছিল ধুমধাম করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে পাত্র এক গুরুতর ও জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। শুক্রবার সকালে তার শারীরিক অবস্থার নাটকীয়ভাবে অবনতি ঘটে। চিকিৎসকরা যখন বুঝতে পারেন রোগীর হাতে সময় অত্যন্ত সীমিত, তখন আর দেরি না করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হাসপাতালেই সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার।
ইতালীয় আইনের বিশেষ প্রয়োগ
ইতালীয় নাগরিক আইন অনুযায়ী, যদি হবু বর বা কনের মধ্যে কেউ আসন্ন মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন বা শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে, তবে বিশেষ বিবেচনায় যেকোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বিয়ের আয়োজন করা সম্ভব। এই বিশেষ আইনি বিধানের সুযোগ নিয়ে রিমিনি পৌরসভার রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে ডেকে পাঠানো হয়।
চিকিৎসক ও নার্সদের মানবিক উদ্যোগ
হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও ইমার্জেন্সি মেডিসিন বিভাগের পরিচালক তিজিয়ানা পেরিন (Tiziana Perin) এই আবেগী মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে বলেন, “এটি ছিল বিশুদ্ধ ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।” জরুরি বিভাগের প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যেও চিকিৎসাকর্মীরা চেয়েছিলেন দিনটিকে ওই দম্পতির জন্য স্মরণীয় করে রাখতে। তারা তাদের কাজের নীল রঙের বিশেষ অ্যাপ্রন থেকে ফিতা কেটে ঘরটিকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেন। প্রথাগত জমকালো আয়োজন না থাকলেও, হাসপাতালের কর্মীদের এই ছোট হাতের তৈরি সাজসজ্জা ঘরটির গুমোট পরিবেশকে এক মুহূর্তেই উৎসবের আমেজে বদলে দেয়।

যেভাবে সম্পন্ন হলো আনুষ্ঠানিকতা
নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সেই কক্ষে দম্পতির সাথে উপস্থিত ছিলেন মাত্র চারজন সাক্ষী, পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সদস্য এবং রিমিনি পৌরসভার কর্মকর্তারা। বাইরে তখন জরুরি বিভাগের স্বাভাবিক ব্যস্ততা চলছিল, কিন্তু সেই বিশেষ কক্ষটিতে যেন সময় থমকে গিয়েছিল। আইনি নিয়ম মেনে দম্পতি একে অপরকে জীবনসঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করার পর সেখানে উপস্থিত ডাক্তার ও নার্সরাও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।
তিজিয়ানা পেরিন আরও জানান, যখন পাত্র ও পাত্রী একে অপরের দিকে তাকিয়ে সারাজীবন পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল ভালোবাসা যেন রোগ এবং মৃত্যুকেও হার মানিয়েছে। তিনি বলেন, “জরুরি বিভাগের একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে এই বিশেষ মুহূর্তের অংশ হতে পারা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের এবং সম্মানের।”
আবেগঘন সমাপ্তি
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর হাসপাতালের কর্মীদের পক্ষ থেকে নবদম্পতিকে শুভেচ্ছা জানানো হয়। ইনফার্মি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, একজন মুমূর্ষু রোগীর শেষ ইচ্ছা পূরণ করা এবং সেই কঠিন সময়ে তাদের মুখে হাসি ফোটানো ছিল হাসপাতালের পুরো টিমের জন্য এক বড় প্রাপ্তি। দুশ্চিন্তা আর বিষাদে ঘেরা একটি দিনে এই বিয়ে যেন হাসপাতালের প্রতিটি কোণে ইতিবাচকতার বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
রিমিনি শহরের এই ঘটনাটি বর্তমানে ইতালির স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে ভালোবাসার জয়গান আর স্বাস্থ্যকর্মীদের মানবিকতার প্রশংসা করা হচ্ছে।
১৪ আগস্ট শুক্রবার, রিমিনির ইনফার্মি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গুরুতর অসুস্থ পাত্রের দ্রুত অবনতিশীল অবস্থার মধ্যে চিকিৎসক, পরিবার ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয় এক আবেগঘন বিয়ে।
corrieredibologna.corriere


