ইতালিতে কিশোরী মেয়ের আত্মহত্যার চেষ্টা: পৈশাচিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক বিয়ের পরিকল্পনার অভিযোগে বাংলাদেশি বাবা গ্রেপ্তার

4 Min Read

রিমিণি শহরে নিজ পরিবারের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নৃশংসতা ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে ৫৩ বছর বয়সী এক প্রবাসীকে কারাগারে পাঠিয়েছে ইতালীয় পুলিশ।

ইতালির পর্যটন শহর রিমিণিতে (Rimini) এক ১৫ বছর বয়সী বাংলাদেশি কিশোরীর আত্মহত্যার চেষ্টাকে কেন্দ্র করে বেরিয়ে এসেছে এক ভয়াবহ পারিবারিক নির্যাতনের চিত্র। দীর্ঘ তদন্তের পর, ওই কিশোরীর ৫৩ বছর বয়সী বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে স্থানীয় পুলিশ (Carabinieri)। অভিযুক্ত ব্যক্তি রিমিণির রিভাজুরা এলাকায় একটি কাবাব শপের মালিক। তার বিরুদ্ধে নিজ স্ত্রী, শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তান এবং দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

ইতালীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালে, যখন ওই কিশোরীর বয়স ছিল ১৪ বছর। একদিন স্থানীয় একটি পার্কে ঘুরতে যাওয়ার অপরাধে বাবা তাকে প্রচণ্ড মারধর করেন। বাবার এই অমানুষিক নির্যাতন সইতে না পেরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে ওই কিশোরী বিপুল পরিমাণ কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করে। সংকটাপন্ন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হলে চিকিৎসকদের প্রচেষ্টায় সে যাত্রায় তার প্রাণ রক্ষা পায়।

কিশোরীর এই আত্মহত্যার চেষ্টার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে ওই পরিবারে চলমান বছরের পর বছর ধরে চলা নির্যাতনের ইতিহাস। তদন্তে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি কেবল তার মেয়েকেই নয়, বরং তার স্ত্রী এবং অন্য সন্তানদের ওপরও নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন চালাতেন। এমনকি তার বড় ছেলে, যিনি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী, মায়ের ওপর আক্রমণ ঠেকাতে আসলে তাকেও নির্দয়ভাবে মারধর করা হতো। চার বছর বয়সী ছোট সন্তানটিকেও ঝাড়ুর লাঠি দিয়ে আঘাত করার মতো নৃশংসতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

তদন্তকারীদের মতে, অভিযুক্ত ব্যক্তি তার কিশোরী কন্যাকে নিয়ে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি মেয়েটিকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে পাঠিয়ে সেখানে পারিবারিকভাবে একটি ‘অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ’ বা জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, এর আগেও তিনি এমন চেষ্টা চালিয়েছিলেন এবং সেই সময়ও তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

রিমিণি আদালতের প্রাথমিক তদন্তকারী বিচারক (GIP) আন্দ্রেয়া ফালাশেত্তি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। বিচারক তার পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বাইরে থাকলে পরিবারের সদস্যদের ওপর পুনরায় হামলার এবং অধিকতর শারীরিক ক্ষতির তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গত ২৬ আগস্ট পুলিশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে রিমিণি কারাগারে পাঠায়।

পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াটি সমন্বয় করেছেন প্রসিকিউটর দাভিদে এরকোলানি। বর্তমানে ভুক্তভোগী মা এবং তার তিন সন্তানকে পুলিশের নিরাপত্তায় একটি গোপন সুরক্ষা কেন্দ্রে (Protected Shelter) রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা পুলিশ ও সমাজসেবা কর্মীদের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে থাকাকালীন সময় থেকেই এই নির্যাতনের শুরু হয়েছিল, যা ইতালিতে আসার পর আরও চরম আকার ধারণ করে। এমনকি ধর্মীয় উৎসবের দিনগুলোতেও সামান্য অজুহাতে মেয়েটির মাথা দেওয়ালে ঠুকে দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর আচরণ করতেন ওই বাবা।

এই ঘটনাটি ইতালিতে বসবাসরত অভিবাসী বিশেষ করে বাংলাদেশি কমিউনিটির মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইতালীয় প্রশাসন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, পারিবারিক ঐতিহ্য বা সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে নারী ও শিশুদের ওপর কোনো ধরনের শারীরিক নির্যাতন বা জোরপূর্বক বিয়ের চেষ্টা বরদাশত করা হবে না। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে এখন ‘পারিবারিক অসদাচরণ’, ‘গুরুতর শারীরিক আঘাত’ এবং ‘জোরপূর্বক বিয়েতে বাধ্য করার চেষ্টা’র অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে।


রিমিনিতে ১৫ বছরের কিশোরীর আত্মহত্যার চেষ্টার পর দীর্ঘদিনের পারিবারিক নির্যাতন ও বাংলাদেশে জোরপূর্বক বিয়ের অভিযোগে ৫৩ বছর বয়সী বাবাকে গ্রেপ্তার করেছে ইতালির পুলিশ।

corrieredibologna

Share This Article