রোমে জীবনযাত্রার ব্যয় ও দারিদ্র্য সংকট: ২০২৫ সালে কারিতাসের কাছে সহায়তার আবেদন ৬০ হাজার মানুষের

4 Min Read

ইতালির ক্যাথলিক দাতব্য সংস্থা কারিতাস রোমার বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের তীব্র সংকটের চিত্র; সাহায্যপ্রার্থীদের ৪৩ শতাংশই প্রথমবার শরণাপন্ন হয়েছেন, যার মধ্যে একটি বড় অংশ অভিবাসী ও বিদেশি নাগরিক।

ইতালির রাজধানী রোমে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাবে চরম অর্থনৈতিক চাপে পড়েছেন সাধারণ নিম্নআয়ের মানুষ ও অভিবাসী জনগোষ্ঠী। ক্যাথলিক চার্চ পরিচালিত প্রভাবশালী মানবিক ও দাতব্য সংস্থা কারিতাস রোমা (Caritas di Roma)-র প্রকাশিত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত এক বছরে বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে সংস্থাটির কাছে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সহায়তা চেয়েছেন। ক্ষুধা নিবারণ, আবাসন সংকট ও কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো জরুরি খাতগুলোতে সংস্থাটির সহায়তা গ্রহণকারীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে।

প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজধানী রোমের ২৪১টি ক্যাথলিক প্যারিশ বা গির্জাভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং ১ হাজার ৬০০ জনেরও বেশি নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে এই সামগ্রিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। গত বছর কারিতাসের বিভিন্ন তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্রে (Centri di ascolto) ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করেছেন ১২ হাজার ৬১৯ জন। সার্বিক পরিসংখ্যানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের ৪৩ শতাংশই ২০২৫ সালে নিজেদের জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দ্বারে আসতে বাধ্য হয়েছেন। প্রধান তিনটি ডায়োসেসান কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, সাহায্যপ্রার্থীদের মধ্যে অভিবাসী ও শরণার্থী কেন্দ্রে এসেছেন ৩ হাজার ৪ জন, স্থানীয় ইতালীয় পরিবারের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রে ১ হাজার ২২০ জন এবং অস্টিয়া (Ostia) এলাকার কেন্দ্রে গেছেন ১৯৯ জন। এছাড়া স্থানীয় ২৪১টি প্যারিশভিত্তিক পরামর্শকেন্দ্র থেকে ৮ হাজার ১৯৬ জনকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, যা পরিবারের সদস্যদের যুক্ত করলে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ১৩২ জনে।

খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিদেশি অভিবাসীদের ওপর সংকটের প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কারিতাস পরিচালিত তিনটি কমিউনিটি রান্নাঘর বা লঙ্গরখানায় (mense) ১২ হাজার ২৯৭ জন মানুষকে মোট ৩ লাখ ১০ হাজার ৫৬৫ বেলা খাবার পরিবেশন করা হয়েছে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই খাদ্য সহায়তার সুবিধাভোগীদের ৭৬ শতাংশই ছিলেন বিদেশি নাগরিক এবং এদের মধ্যে ৩ হাজার ৫৩৫ জন ব্যক্তি সম্পূর্ণ নতুনভাবে খাবারের লাইনে যুক্ত হন। একই সঙ্গে রোমে সক্রিয় পাঁচটি ‘সংহতি বাজার’ বা এম্পোরি দেল্লা সলিদারিয়েতা (Empori della solidarietà)-র মাধ্যমে ১ হাজার ৩৬২টি সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে (প্রায় ৪ হাজার ২০০ ব্যক্তি) খাদ্যপণ্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ফুড ভাউচার (Buoni spesa)-এর মাধ্যমে আরও ১ হাজার ৩৯টি পরিবারের ৩ হাজার ২১০ জন মানুষকে সরাসরি কেনাকাটায় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।

রাজধানীর তীব্র আবাসন সংকট মেটাতেও আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। শহরের ডন লুইজি দি লিয়েগ্রো হোস্টেলে (Ostello Don Luigi Di Liegro) ৫৫৪ জন গৃহহীন মানুষ মোট ৬৩ হাজার ৮২৬ রাত অবস্থান করেছেন এবং কাসা সান্তা জাকিন্তা (Casa Santa Giacinta) কেন্দ্রে আশ্রয় পেয়েছেন ১২৬ জন মানুষ, যেখানে তাঁদের অবস্থানের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৯৮৩ রাত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি সাই (SAI) প্রকল্পের অধীনে ‘কাসা সান্তা বাখিতা’ (Casa Santa Bakhita) কেন্দ্রে শিশুসহ ৩৫ জন মা এবং ‘ফেরহোটেলে’ (Ferrhotel) ৫৩ জন পুরুষকে আবাসন ও পুনর্বাসন সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত প্রান্তিক মানুষের জন্য কারিতাসের স্বাস্থ্য কর্মসূচিও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। রোমের প্রধান তেরমিনি রেলওয়ে স্টেশনের (Stazione Termini) পলিক্লিনিকে বিশ্বের ১১৭টি দেশের ৩ হাজার ৭০৭ জন নাগরিককে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২ হাজার ৪৮৬ জন রোগীকে নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় এনে ১৭ হাজার ১১২টি প্রত্যক্ষ স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়, যার মধ্যে ১ হাজার ৩১৮ জনই ছিলেন সম্পূর্ণ নতুন রোগী। এছাড়া বিশেষায়িত ডেন্টাল সেন্টারে ৭৮৮ জন রোগীকে ৩ হাজার ৩৩০টি দাঁতের সেবা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাবৈষম্য দূরীকরণে কারিতাসের অর্থায়নে রোমের ৮২টি প্যারিশে বিশেষ স্কুল-পরবর্তী শিক্ষা কর্মসূচি (doposcuola) সচল রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৯টি প্যারিশে এই উদ্যোগ গত বছরই প্রথমবারের মতো শুরু হয়।


২০২৫ সালে রোমের কারিতাসের কাছে সহায়তা চেয়েছেন প্রায় ৬০ হাজার মানুষ; ২৪১টি প্যারিশের ১,৬০০-এর বেশি স্বেচ্ছাসেবক খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষাসহায়তা দিয়েছেন।

ansa

Share This Article