কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারানোর প্রায় এক মাস পরও মৃত্যুসনদ না পৌঁছানোয় শেষকৃত্য বা মরদেহ দেশে পাঠানো নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা; কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা অবহেলার বিষয়ে শুরু হয়েছে তদন্ত।
ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় নাপোলি প্রদেশের সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানোতে কর্মস্থলে মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আহমেদ মো. রেজা (৩১) নামের এক বাংলাদেশি অভিবাসী তরুণ। তবে মৃত্যুর প্রায় এক মাস পার হতে চললেও এক অভূতপূর্ব প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছে তার পরিবার। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক তথ্য না পৌঁছানোয় স্থানীয় পৌরসভার নথিপত্রে এই প্রবাসী এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জীবিত’ হিসেবে নিবন্ধিত আছেন। ফলে হাসপাতাল মর্গে পড়ে থাকা মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর, দাফন কিংবা বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে ফেরত পাঠানোর আইনি প্রক্রিয়া পুরোপুরি থমকে গেছে।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানোর একটি কৃষি নার্সারিতে কাজ করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হন আহমেদ। সহকর্মীর পরিচালিত একটি ফর্কলিফটের (মালবাহী ছোট বাহন) ধাক্কায় তিনি বেশ ওপর থেকে নিচে ছিটকে পড়েন এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত নেপলসের ‘ওসপেদালে দেল মারে’ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চার দিন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে মৃত্যুর সাথে লড়ে ১৬ অক্টোবর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই তরুণ। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্থানীয় পুলিশ বাহিনীকে এই গুরুতর কর্মদুর্ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি। পরে হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে খবর পেয়ে স্থানীয় ক্যারাবিনিয়ারি পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করে।

আইনি নিয়মানুযায়ী চিকিৎসাকেন্দ্রে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা স্থানীয় পৌরসভা বা নাগরিক নিবন্ধন দফতরে (Anagrafe) অবহিত করতে হয়। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক মৃত্যুর বিজ্ঞপ্তি বা সনদ না পাঠানোয় সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানো পৌরসভা নথিপত্রে আহমেদকে মৃত তালিকাভুক্ত করতে পারছে না। কেবল গণমাধ্যমের সংবাদের ওপর ভিত্তি করে পৌর কার্যালয়ের পক্ষে সনদ দেওয়ার কোনো আইনি সুযোগ নেই। আর অফিশিয়াল মৃত্যুসনদ না থাকায় ইতালির জাতীয় কর্মদুর্ঘটনা বীমা সংস্থা ইনাইল (INAIL)-এর ক্ষতিপূরণ দাবি এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্ঘটনার পর নিরাপত্তা ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের বৈধতা নিয়েও বড় ধরনের অসঙ্গতি প্রকাশ পেয়েছে। স্থানীয় সহকর্মীদের বরাতে জানা যায়, আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে আসছিলেন। কিন্তু জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা ইনপস (INPS)-এর নথিতে তার নিয়মিত বা নিরবচ্ছিন্ন কোনো কর্মচুক্তির প্রমাণ মেলেনি। এছাড়া দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় পৌর পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিল বলে জানা গেলেও, তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আলামত সংগ্রহ বা মামলা করেছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আদালতের নির্দেশে মরদেহটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও বিস্তারিত ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে আরও অন্তত ৬০ দিন সময় লাগবে বলে জানা গেছে।
২০২৩ সালে এক ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে সোনালী ভবিষ্যতের আশায় ইতালি এসেছিলেন আহমেদ। তিনি সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানোর একটি অস্থায়ী অভিবাসী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছিলেন। বাংলাদেশে থাকা তার বিধবা মা এবং ছোট ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল একদিন ইতালিতে এসে তার সঙ্গে যোগ দেবেন। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, গত ১৪ অক্টোবর নাপোলির পুলিশ সদর দফতরে (Questura) তার স্টে পারমিট বা বসবাসের অনুমতিপত্র (Permesso di soggiorno) নবায়নের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সেদিন তিনি হাসপাতালের বিছানায় কোমায় ছিলেন। বর্তমানে পর্তুগাল থেকে তার এক নিকটাত্মীয় এসে স্থানীয় আইনজীবী ও প্রশাসনের সহায়তায় মরদেহ দেশে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। পৌর প্রশাসন জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের আগে স্থানীয়ভাবে তার স্মরণে একটি আনুষ্ঠানিক শোকসভার আয়োজন করা হবে।
বাংলাদেশি অভিবাসী ৩১ বছর বয়সী আহমেদের কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরও ইতালির পৌর নথিতে তিনি জীবিত; মৃত্যু সনদ না থাকায় আটকে আছে দাফন, তদন্ত ও পরিবারের প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া।
napolitan.it


