কৃষিজমিতে কাজ শেষে ফেরার পথে সাইকেলে ট্রাক্টরের ধাক্কা ও জাহাজ কারখানায় বিস্ফোরণে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন দুই বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা; অক্টোবরে রেকর্ড প্রাণহানির ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতা ও অবহেলার বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে ইতালিজুড়ে।
ইতালির বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি এবং দায়িত্বশীলদের চরম গাফিলতির কারণে প্রাণহানির ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দেশটির বিভিন্ন খাতে কেবল অক্টোবর মাসেই কাজ করতে গিয়ে অন্তত ৪২ জন শ্রমিকের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এই দীর্ঘ মৃত্যুমিছিলে যুক্ত হয়েছে দুই বাংলাদেশি তরুণ কর্মীর নাম। জীবিকার তাগিদে দেশটিতে যাওয়া এই প্রবাসীদের একজন মাঠে কৃষিকাজ শেষে ফেরার পথে সড়কে এবং অন্যজন ঐতিহ্যবাহী জাহাজ নির্মাণ কারখানায় বিস্ফোরণে মারাত্মক দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। একের পর এক এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিসহ পুরো ইতালির শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির চিয়োচারিয়া (Ciociaria) অঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের কাজ করতেন বাংলাদেশি নাগরিক রুবেল মিয়া। সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম শেষে তিনি বাইসাইকেল চালিয়ে বাসায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে এক স্থানীয় কৃষকের বেপরোয়া গতির ট্রাক্টর তাকে সজোরে আঘাত করে। চালক আহত রুবেলকে উদ্ধারের চেষ্টা না করে নির্দয়ভাবে রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায়। ফলে কোনো ধরনের প্রাথমিক চিকিৎসা না পেয়ে ঘটনাস্থলেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নিথর হয়ে যায় রুবেলের দেহ। জানা গেছে, তরুণ এই প্রবাসীর পরিবার বা কোনো নিকটাত্মীয় ইতালিতে বসবাস করেন না। দেশটিতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি সুরক্ষা ছাড়াই রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করা হাজারো অভিবাসী কৃষিশ্রমিকের ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের বাস্তব প্রতিফলন রুবেলের এই করুণ পরিণতি।

অন্যদিকে, মারকে অঞ্চলের আনকোনার (Ancona) বিখ্যাত ফিনকানতিয়েরি (Fincantieri) শিপইয়ার্ডে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরেক বাংলাদেশি তরুণ কবির মিদুল। বয়স ত্রিশ পূর্ণ হওয়ার আগেই তার জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। গত ২৯ সেপ্টেম্বর ওই জাহাজ কারখানায় কাজ করার সময় আকস্মিক এক বিস্ফোরণ ঘটলে কবির এবং তার তিউনিসিয়ান সহকর্মী সোফিয়ান বুত্রা অগ্নিদগ্ধ হন। সোফিয়ান ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় কবিরকে বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। প্রায় এক মাস মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি।
ইতালিতে কর্মস্থলের অনিরাপদ পরিবেশ কেবল অভিবাসীদের জন্যই নয়, স্থানীয়দের জন্যও প্রতিনিয়ত মরণফাঁদে পরিণত হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিহতদের মধ্যে যেমন প্রবীণরা রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন সদ্য কর্মজীবনে পা রাখা তরুণ শিক্ষার্থীরাও। ভিচেনসায় একটি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানায় উচ্চচাপযুক্ত বাষ্পের ধাক্কায় মারা যান তরুণ দানিয়েলে গ্রেমিস। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি সম্পন্ন করার ঠিক আগমুহূর্তে একটি ওয়াইনারিতে কাজ করতে গিয়ে ভারী যন্ত্রপাতির আঘাতে মাথায় গুরুতর চোট পান ২১ বছর বয়সী আন্দ্রেয়া দি রিসিয়ো; এক মাস হাসপাতালে লড়াই করে তিনিও মারা যান। এ ছাড়া ফ্রোজিনোনেতে (Frosinone) একটি বিদ্যালয়ের ছাদ সংস্কারের কাজ করার সময় নিচে পড়ে গুরুতর আহত হওয়া ৩৮ বছর বয়সী এক নির্মাণশ্রমিক দুই দিন হাসপাতালে যন্ত্রণায় ভুগে প্রাণ হারান।
ইতালিতে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুকে সাধারণত ‘মর্তি বিয়ানকে’ বা দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়। তবে শ্রম অধিকারকর্মীরা বলছেন, এটিকে নিছক দুর্ঘটনা বলা মূলত দায় এড়ানোর নামান্তর। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জামের অভাব, কালোবাজারি শ্রম বা নিবন্ধনহীন নিয়োগ (লাভোরো নেরো) এবং মাত্রাতিরিক্ত কাজের চাপই এই প্রাণহানিগুলোর মূল কারণ। অনেক ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের অমানবিক অবহেলার বিষয়টি প্রমাণ করতেই বছরের পর বছর লেগে যায়। যেমনটি ঘটেছিল ২০২৪ সালে পুগলিয়া (Puglia) অঞ্চলে। সেখানে গাছ থেকে পড়ে যাওয়ার পর মালিক তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা না দেওয়ায় জুসেপ্পে পেত্রাম নামের এক শ্রমিক মারা যান, যা উন্মোচন করতে তদন্তকারীদের দুই বছর সময় লেগেছিল। অক্টোবর মাসে ৪২ জন শ্রমিকের এমন ধারাবাহিক মৃত্যু দেশটির কর্মক্ষেত্রে কঠোর তদারকি ও আইনি জবাবদিহিতা নিশ্চিতের দাবিকে আবারও জোরালো করে তুলেছে।
ফ্রোসিনোনে স্কুল সংস্কারকাজের সময় ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত ৩৮ বছর বয়সী এক শ্রমিক দুই দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর মারা গেছেন; কর্মক্ষেত্রে প্রাণহানির তালিকায় যুক্ত হলো আরও একটি নাম।
Tg3


