সারা দেশের ১০৬টি ভ্রাম্যমাণ পুলিশ স্কোয়াডের দুই সপ্তাহের চিরুনি অভিযানে আড়াই লক্ষাধিক তরুণের পরিচয় যাচাই করা হয়েছে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির পাশাপাশি অবৈধ মাদকের আখড়া ও অপরাধী চক্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইতালিতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়া কিশোর অপরাধ, তথাকথিত ‘বেবি গ্যাং’-এর সহিংসতা এবং সামাজিক অস্থিরতা প্রতিরোধে দেশজুড়ে নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় পুলিশ। গত দুই সপ্তাহব্যাপী পরিচালিত এই সমন্বিত বিশেষ অভিযানে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মিলিয়ে মোট ৬৪৪ জন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় পুলিশ সদর দপ্তরের সেন্ট্রাল অপারেশনাল সার্ভিসের (SCO) সরাসরি তত্ত্বাবধানে সারা দেশের ১০৬টি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের (কোয়েস্তুরা) মোবাইল স্কোয়াড এবং অপরাধ দমন প্রতিরোধ বিভাগ একযোগে এই বিশেষ অভিযান বাস্তবায়ন করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অভিযানের অংশ হিসেবে সারা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা, আড্ডাস্থল ও মাদক কারবারের কেন্দ্রগুলো থেকে মোট ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৩৮ জন তরুণের তথ্য ও গতিবিধি যাচাই করা হয়, যার মধ্যে ২৩ হাজার ৬০ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৭৫ জন প্রাপ্তবয়স্ক এবং অপরাধমূলক চক্রে জড়িয়ে পড়া ৬৯ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে। এ ছাড়া চুরি-ছিনতাই, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা এবং চোরাই মালামাল কেনাবেচায় জড়িত থাকার অভিযোগে আরও ১ হাজার ৬৯৫ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশ জানায়, চিহ্নিত এসব কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, মারামারি, চাঁদাবাজি, সরকারি কাজে বাধা এবং ভাঙচুরের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের ঘটনাগুলো তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও আকারে ছড়িয়ে দিয়ে ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করত।

অভিযানকালে সারা দেশের ২৯৯টি সন্দেহভাজন বাড়ি ও আবাসনে তল্লাশি চালানো হয়, যার মধ্যে অভিভাবকহীন বিদেশি অপ্রাপ্তবয়স্কদের ৩৯টি আশ্রয়কেন্দ্রও রয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ১৪৯টি নাইটলাইফ স্পট, ৩৬৫টি গেমিং ক্লাব, ৮৯৬টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ১৭৭টি রেলওয়ে স্টেশন এবং ১৯৮টি উন্মুক্ত পার্কে তল্লাশি চালানো হয়। ব্যাপক এই তল্লাশিতে উদ্ধার করা হয়েছে ২৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২১০টি ধারালো দেশীয় অস্ত্র, হাতবোমাসহ বিস্ফোরক, বেসবল ব্যাট এবং পিপার স্প্রে। একই সঙ্গে ছিনতাই হওয়া বিপুল পরিমাণ সোনার চেইন, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার ইউরো সমমূল্যের অবৈধ নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়। মাদকবিরোধী তৎপরতায় প্রায় ৭০ কেজি কোকেন, ১৭৫ কেজি গাঁজা ও হাশিশ এবং ৩২৮ গ্রাম হেরোইনসহ নানা ধরনের উত্তেজক ওষুধ জব্দ করা হয়েছে।
অপরাধীদের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে অনলাইনে ১ হাজার ১১৫টি সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলে কড়া নজরদারি রাখা হয় এবং তুরিঁ শহরে অস্ত্র প্রদর্শনকারী তিনটি অ্যাকাউন্ট বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লম্বার্দিয়া অঞ্চলের মিলান, মোনৎসা ও কোমো এলাকায় সাম্প্রতিক বিক্ষোভ চলাকালীন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পরিকল্পনা তদন্ত করতে গিয়ে তরুণদের মোবাইল চ্যাট থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। অন্যদিকে ফজ্জা (Foggia) অঞ্চলে স্থানীয়দের ‘ইউ-পল’ (Youpol) অ্যাপের সতর্কবার্তার ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি গোপন ‘ক্র্যাক হাউস’ বা মাদক তৈরির কারখানার সন্ধান পায় পুলিশ। সেখানে কোকেন প্রক্রিয়াজাত করে ক্র্যাক তৈরি এবং সেবনের ব্যবস্থা রাখা হতো।
অভিযান শেষে বিচারিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে চিহ্নিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে শহর থেকে বহিষ্কারের আদেশ (ফোলিও দি ভিয়া) এবং নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধকরণসহ (নগরের দাসপো) কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিবাসী পরিবারসহ সাধারণ নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষায় এমন অভিযানকে স্বস্তিদায়ক বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের নিজেদের সন্তানদের বাস্তব ও অনলাইন কার্যকলাপের প্রতি আরও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন।
ইতালিজুড়ে পুলিশের দুই সপ্তাহের বিশেষ অভিযানে ৬৪৪ জন গ্রেপ্তার, ১ হাজার ৬৯৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং বিপুল পরিমাণ মাদক, আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র উদ্ধার।
Tg7


