ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার সহায়তায় বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে উত্তর আফ্রিকার ১৩ নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে রোম। অবৈধ অভিবাসীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে সীমান্তে ঠেলে দেওয়াকে ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’ বলে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি।
অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে আরও একধাপ কঠোর অবস্থান নিয়ে বিশেষ চার্টার্ড বিমানের মাধ্যমে ১৩ জন উত্তর আফ্রিকান নাগরিককে তাদের নিজ দেশে ফেরত (ডিপোর্ট) পাঠিয়েছে ইতালি প্রশাসন। ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের (Frontex) সরাসরি সহযোগিতায় এবং ইতালির কেন্দ্রীয় অভিবাসন ও সীমান্ত পুলিশের সমন্বয়ে এই প্রত্যাবাসন অভিযান পরিচালিত হয়। পুরো যাত্রায় বহিষ্কৃতদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন দেশটির জননিরাপত্তা বিভাগের বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এসকর্ট দলের সদস্যরা।
ইতালীয় কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের প্রায় সবার বিরুদ্ধেই ব্যক্তি ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন সংক্রান্ত ফৌজদারি অপরাধ ও পুলিশের তালিকায় রেকর্ড ছিল। বিশেষ করে, বহিষ্কৃতদের মধ্যে একজন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন, যার বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আদেশে গত ৯ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক বহিষ্কারাদেশ জারি করা হয়েছিল। তদন্তে জানা যায়, ওই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ছড়ানো ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু এবং নাগরিকদের ওপর সহিংস হামলা চালানোর প্রকাশ্য উসকানি দিয়ে আসছিলেন। ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি গভীর বিদ্বেষ পোষণকারী এই ব্যক্তিকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি বিবেচনা করে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

আইনি ও মানবাধিকারের দিক বিবেচনা করে পুরো বহিষ্কার প্রক্রিয়াটি কঠোর নজরদারিতে সম্পন্ন হয়েছে। প্রত্যাবাসন কার্যক্রমে অভিবাসীদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য বিমানে উপস্থিত ছিলেন ইতালির জাতীয় মানবাধিকার সুরক্ষা কমিশন (Garante nazionale dei diritti) এবং ফ্রন্টেক্সের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয়ের (Fundamental Rights Office) পর্যবেক্ষকরা। তাদের উপস্থিতিতেই কোনো ধরণের আইনি জটিলতা বা আপত্তি ছাড়াই সফলভাবে বহিষ্কারাদেশ কার্যকর হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছর অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীন তৎপরতা দেখাচ্ছে ইতালি সরকার। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি অনিয়মিত অভিবাসীকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় অনেকটাই বেশি। এছাড়া চলতি বছর সমুদ্রপথে ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে ২৪ হাজার ৫৪০ জনে দাঁড়িয়েছে। যেখানে গত বছরের একই সময়ে প্রবেশের সংখ্যা ছিল ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। ফলে আগত মোট অভিবাসীর প্রায় ১০ দশমিক ২ শতাংশকেই এ বছর সফলভাবে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছে।
এদিকে ইউরোপীয় কাউন্সিল বৈঠকের আগে দেশটির সিনেটে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সীমান্ত পরিস্থিতির প্রভাব তুলে ধরেন। মেলোনি বলেন, আধুনিক হাইব্রিড যুদ্ধের কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা থাকে না। ড্রোন দিয়ে আকাশসীমা লঙ্ঘন, সমুদ্রে সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করা, সাইবার আক্রমণ এবং বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারের মতো বিষয়গুলো ইউরোপের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে অভিবাসীদের কৌশলে সীমান্তে ঠেলে দিয়ে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাও এই অঘোষিত হাইব্রিড যুদ্ধের একটি বিপজ্জনক অংশ।
ইতালির উদ্যোগে ফ্রন্টেক্সের সহায়তায় ১৩ জন উত্তর আফ্রিকীয়কে চার্টার ফ্লাইটে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে; এ বছর এখন পর্যন্ত অনিয়মিত ৬,৮০০-এর বেশি অভিবাসী প্রত্যাবাসিত হয়েছে।
ansa


