দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে বছরে ৪ হাজার কর্মী নেওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছেন পাঁচশরও কম; বিকল্প হিসেবে ভার্চুয়াল সাক্ষাৎকার ও বোয়েসেলের মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব ঢাকার।
বাংলাদেশ ও গ্রিসের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় শ্রম সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় গ্রিসের শ্রমবাজারে নতুন কর্মী প্রেরণের প্রক্রিয়া বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। ২০২২ সালে সই হওয়া এই ঐতিহাসিক চুক্তির আওতায় প্রতি বছর চার হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে বৈধভাবে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, এখন পর্যন্ত পাঁচশরও কম কর্মী দেশটিতে পৌঁছাতে পেরেছেন। মূলত কনস্যুলার ও ভিসা সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতার কারণেই এই লক্ষ্যপূরণ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গ্রিসে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা।
অভিবাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দায়িত্ব গ্রহণের পর দূতাবাস থেকে সেবা নেওয়া প্রবাসীদের তথ্যের ভিত্তিতে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের পর থেকে বৈধ চ্যানেলে গ্রিসে আসা কর্মীর সংখ্যা খুবই নগণ্য।
দিল্লির ভিসা কেন্দ্র ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রভাব
চুক্তির আওতায় মৌসুমি কর্মী হিসেবে গ্রিসে যাওয়ার জন্য আবেদনকারীদের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভৌগোলিক দূরত্ব। গ্রিস কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ পাসপোর্ট, চাকরির চুক্তিপত্র, পুলিশ ছাড়পত্র ও ভিসা ফি জমার প্রমাণপত্রসহ প্রার্থীদের ভারতের নয়াদিল্লিস্থ গ্রিক দূতাবাসে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ভিসা সাক্ষাৎকার দিতে হয়। ফলে বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য ভারতীয় ভিসা নেওয়া বাধ্যতামূলক।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা পাওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক প্রার্থী গ্রিক ভিসার সাক্ষাৎকারের ডাক পেলেও ভারতীয় ভিসা না পাওয়ায় যথাসময়ে নয়াদিল্লি যেতে পারছেন না। এ ছাড়া গ্রিক নিয়োগদাতা ও কর্মীর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের জন্য নির্ধারিত স্বল্প সময়সীমাও আবেদনকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

বিকল্প ব্যবস্থার প্রস্তাব ও গ্রিসের প্রতিক্রিয়া
এই জটিলতা নিরসনে গ্রিক কর্তৃপক্ষের কাছে বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরেছে বাংলাদেশ দূতাবাস। রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা জানান, দিল্লি যাওয়ার বাধ্যবাধকতা এড়াতে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে অনলাইনে সাক্ষাৎকার গ্রহণ কিংবা বিকল্প কোনো স্থান নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুরো নিয়োগ ও ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণে রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড’কে (বোয়েসেল) মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে।
গ্রিসের অভিবাসন ও আশ্রয় মন্ত্রণালয় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং কারিগরি দিকগুলো খতিয়ে দেখছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সময়সীমা ঘোষণা করেনি দেশটি। রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন, ধীরগতিতে হলেও আলোচনা এগিয়ে চলছে এবং প্রক্রিয়াটি সহজ করার বিষয়ে উভয় পক্ষই নীতিগতভাবে একমত।
অনিয়মিতদের বৈধকরণে অগ্রগতি ও চুক্তি সম্প্রসারণ
নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থবিরতা থাকলেও চুক্তির অপর শর্ত অনুযায়ী পূর্বে অবস্থানরত অনথিভুক্ত বাংলাদেশিদের নিয়মিতকরণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। গ্রিক অভিবাসন নীতি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ১০ হাজার ৩৩৭ জন অনিয়মিত বাংলাদেশি বৈধতার আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪০৫ জন ইতোমধ্যে বৈধ বসবাসের অনুমতিপত্র (রেসিডেন্স পারমিট) পেয়েছেন এবং বিভিন্ন শর্ত পূরণ না হওয়ায় ১ হাজার ৯টি আবেদন বাতিল হয়েছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি এর পরিধি কেবল কৃষিতে সীমাবদ্ধ না রেখে নির্মাণ, পর্যটন, হোটেল ও সেবা খাতেও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা পরিহারের আহ্বান
বৈধ পথ জটিল ও দীর্ঘ হওয়ায় অনেক বাংলাদেশি পরিচিতজনদের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নিচ্ছেন এবং পাচারকারীদের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসের ক্রিট ও গাভদোস দ্বীপে প্রবেশের ঝুঁকি নিচ্ছেন। এ বিষয়ে কঠোর সতর্কতা উচ্চারণ করে রাষ্ট্রদূত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দালাল ও অতিরিক্ত ফি দাবি করা চক্রকে এড়িয়ে কেবল বোয়েসেল ও দূতাবাসের প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
গ্রিসে বৈধভাবে কর্মী নেওয়ার চুক্তি থাকলেও ভিসা ও নিয়োগ জটিলতায় বছরে ৪ হাজারের লক্ষ্যের বিপরীতে এখন পর্যন্ত ৫০০ জনেরও কম বাংলাদেশি বৈধভাবে পৌঁছেছেন।
infomigrants


