ইতালির ত্রিয়েস্তেতে পরিত্যক্ত ভবনে আগুনে পুড়ে তরুণ যুগলের মৃত্যু: আশ্রয় সংকট ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় ক্ষোভ

3 Min Read

তীব্র শীতে উষ্ণতা পাওয়ার জন্য আগুন জ্বালাতে গিয়ে অভিবাসীদের অস্থায়ী আবাসে অগ্নিকাণ্ডে দুইজনের করুণ পরিণতি হয়েছে; আশ্রয়কেন্দ্রে আসন খালি থাকা সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় রাস্তায় রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন আশ্রয়প্রার্থীরা।

ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর ত্রিয়েস্তের পোর্তো ভেক্কিও এলাকার একটি জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে এক তরুণ যুগলের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচতে তারা ভবনটির ভেতরে আগুন জ্বালিয়েছিলেন। তবে মুহূর্তের মধ্যেই সেই আগুন বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে সবকিছু গ্রাস করে নেয়। নিহতদের মধ্যে একজন স্থানীয় ইতালীয় তরুণী এবং অপরজন মরোক্কান বংশোদ্ভূত তরুণ বলে জানা গেছে। তবে আইনি প্রক্রিয়ার কারণে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পোর্তো ভেক্কিওর এই ভৌতিক ও পরিত্যক্ত গুদামটি দীর্ঘদিন ধরে বলকান রুট পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের অস্থায়ী আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। কনকনে শীত ও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়া এসব মানুষ মেঝেতে কেবল স্লিপিং ব্যাগ বিছিয়ে রাত পার করতেন। কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় স্থানটি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। ফলে এই অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনাকে স্থানীয় নাগরিকরা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং প্রশাসনিক উদাসীনতায় ঘটা একটি ‘পূর্বঘোষিত ট্র্যাজেডি’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।

এই মর্মান্তিক পরিণতির পর ত্রিয়েস্তের অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, শহরের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে অন্তত ৭০টি শয্যা খালি পড়ে আছে। এরপরেও গৃহহীন মানুষদের খোলা আকাশের নিচে রাস্তায় ঘুমাতে হচ্ছে। তারা জানান, এটি কোনো সাময়িক সমস্যা নয়, বরং গত কয়েক মাস ধরে কাঠামোগতভাবেই এই সংকট জিইয়ে রাখা হয়েছে। বিশেষ করে বলকান অঞ্চল দিয়ে পৌঁছানো আশ্রয়প্রার্থীরা পুলিশের সদর দপ্তরে (কোয়েস্তুরা) গেলে তাদের বারবার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সাক্ষাৎকারের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী কাগজপত্রে আশ্রয়ের আনুষ্ঠানিক আবেদন নথিভুক্ত না হওয়ায় স্থানীয় প্রিফেকচুরাও তাদের নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠাতে পারছে না, যা একটি গভীর প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে শহরের মেয়র ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেছেন। মেয়রের মতে, ত্রিয়েস্তে থেকে সকল অভিবাসীকে অন্য শহরে সরিয়ে নেওয়াই হলো এই সংকটের মূল সমাধান। এই বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেদোসির সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসছেন। মেয়রের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে অল্প কিছু মানুষ না সরিয়ে বরং নতুন আসা সকল অভিবাসীকে কেন্দ্রীয়ভাবে অন্য অঞ্চলে নিয়ে যেতে হবে। তবে অধিকারকর্মীরা বিষয়টিকে মূল সংকট সমাধান না করে সমস্যা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা হিসেবে দেখছেন।

এদিকে তরুণ যুগলের নির্মম মৃত্যুর প্রতিবাদে এবং অভিবাসীদের মানবিক অধিকারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। যে চত্বরে ছুটির দিনগুলোতে গৃহহীনদের খাবার বিতরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, সেখানে মোমবাতি হাতে জড়ো হন তিন শতাধিক নাগরিক। শোক ও ক্ষোভে ফেটে পড়া আন্দোলনকারীরা প্রতিটি মানুষের জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তা, আশ্রয় এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।


ত্রিয়েস্তের পোর্তো ভেক্কিও এলাকায় অভিবাসীদের জরাজীর্ণ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত একটি গুদামে ভয়াবহ আগুনে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।

Tg3

Share This Article