ল্যাম্পেডুসার সৈকতে পর্যটকদের সামনেই অভিবাসীদের নাটকীয় অবতরণ: বাংলাদেশিসহ উদ্ধার ১২৮

4 Min Read

লিবিয়া থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা ১২৮ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে ইতালির কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে সৈকতে পর্যটকদের উপস্থিতিতে নামা একটি দলের সদস্যদের প্রতি স্থানীয় ও পর্যটকদের মানবিক সহায়তার চিত্র অনন্য এক নজির সৃষ্টি করেছে।

ইতালির ল্যাম্পেডুসা দ্বীপের মারে মর্তো (Mare Morto) সৈকতে এক অভাবনীয় ও রুদ্ধশ্বাস ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা ও ভ্রমণে আসা পর্যটকরা। গত বুধবার সকালে যখন সৈকতে পর্যটকরা রোদ পোহাচ্ছিলেন এবং সমুদ্রে স্নান করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রায় ৬৮ জন অভিবাসী বোঝাই একটি বড় নৌকা সরাসরি পাথুরে সৈকতে এসে ভেড়ে। কোনো লুকোছাপা ছাড়াই পর্যটকদের চোখের সামনে ঘটা এই অবতরণ ল্যাম্পেডুসার মানবিক ও সংকটময় পরিস্থিতির এক জলজ্যান্ত চিত্র তুলে ধরেছে।

সৈকতে নাটকীয় অবতরণ ও স্থানীয়দের মানবিকতা

উদ্ধারকারী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১২ মিটার লম্বা একটি নৌকায় করে ৬৮ জন অভিবাসী মারে মর্তো উপসাগরের পাথুরে এলাকায় পৌঁছান। এই দলে একজন নারী এবং ১০ জন শিশুও ছিল। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করলেও, এবার দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। নৌকাটি সৈকতের কাছে আসার সাথে সাথে সেখানে থাকা পর্যটক এবং স্থানীয়রা কোনো দ্বিধা ছাড়াই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন।

ইতালির আর্থিক গোয়েন্দা বাহিনী বা গুয়ার্দিয়া দি ফিনানজা (Guardia di Finanza) এবং কারাবিনিয়েরি (Carabinieri) সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজ শুরু করেন। তবে অবাক করার বিষয় ছিল সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, পুলিশের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকরাও অভিবাসীদের জল থেকে তীরে উঠতে সাহায্য করেন। তৃষ্ণার্ত অভিবাসীদের, বিশেষ করে শিশুদের প্রতি সমবেদনায় অনেকে নিজের কাছে থাকা জল ও পানীয় এগিয়ে দেন। ল্যাম্পেডুসার এই মানবিক সংহতিকে স্থানীয় প্রশাসন ‘এক অসাধারণ ভ্রাতৃত্বের উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

লিবিয়া থেকে বিপজ্জনক যাত্রা

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অভিবাসীরা জানিয়েছেন, তারা গত মঙ্গলবার রাতে লিবিয়ার জুয়ারা (Zuwara) উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ১২ মিটারের এই নৌকাটিতে ৩৫০ অশ্বশক্তির দুটি শক্তিশালী ইঞ্জিন লাগানো ছিল, যার ফলে এটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং নিঃশব্দে সমুদ্র পাড়ি দিতে সক্ষম হয়। এই বিপজ্জনক যাত্রার জন্য জনপ্রতি ১,৬০০ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লক্ষ টাকার বেশি) করে দালালদের দিতে হয়েছে বলে অভিবাসীরা জানিয়েছেন। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই দলটি মূলত উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক।

সমুদ্রে আরও তিনটি উদ্ধার অভিযান

সৈকতে নামা ৬৮ জন ছাড়াও, ওই একই সময়ে সমুদ্রের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে আরও ৬০ জন অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে ইতালির কোস্ট গার্ড (Guardia Costiera) এবং গুয়ার্দিয়া দি ফিনানজা। তিনটি আলাদা ছোট নৌকা থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। প্রথম নৌকায় ১৭ জন (২ নারীসহ), দ্বিতীয়টিতে ২২ জন (৩ নারীসহ) এবং তৃতীয় নৌকাটিতে ২১ জন (৩ শিশুসহ) যাত্রী ছিলেন।

উদ্ধারকৃত এই ৬০ জনের মধ্যে মিশরীয়, সোমালি, পাকিস্তানি এবং ইরিত্রীয়দের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন। তারা লিবিয়ার ত্রিপোলি এবং গার্স গ্যারাবুলি (Gars Garabulli) এলাকা থেকে রওনা হয়েছিলেন। উদ্ধার অভিযান শেষে অভিবাসীদের ব্যবহৃত নৌকাগুলোকে সমুদ্রে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি ও পরবর্তী পদক্ষেপ

উদ্ধারকৃত মোট ১২৮ জন অভিবাসীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর ল্যাম্পেডুসার কন্ট্রাদা ইমব্রিয়াকোলা (Contrada Imbriacola) নামক অভিবাসী সেন্টারে বা ‘হটস্পটে’ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে তারা ইতালীয় রেড ক্রস (Croce Rossa) এর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন। সেখানে তাদের পরিচয় শনাক্তকরণ এবং আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ চলছে।

ল্যাম্পেডুসা দ্বীপটি দীর্ঘকাল ধরে অভিবাসন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও, সাম্প্রতিক এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতালির গণমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যটন মরসুমে এমন ঘটনা ইতালির সীমান্ত নিরাপত্তা এবং মানবিক দায়বদ্ধতার দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে দালালদের মাধ্যমে বিপুল অর্থের বিনিময়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার এই প্রবণতা বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ল্যাম্পেদুসায় সাগরপথে ৬৮ অভিবাসীর আকস্মিক অবতরণ; আরও ৬০ জনকে তিন দফা অভিযানে উদ্ধার করে নিরাপদে হটস্পটে নেওয়া হয়েছে।

tg24.sky

Share This Article