ট্রাম্পের সাথে দূরত্বের আভাস ও অভিবাসন বিতর্ক: আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখে জর্জিয়া মেলোনি

4 Min Read

আমেরিকার সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে অভিবাসী ফেরত পাঠানোর পদক্ষেপে চাপের মুখে ইতালি; তবে ৮০ হাজার প্রত্যাবাসন অনুরোধ বাতিলের তথ্য দিয়ে শক্ত অবস্থানের বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ—উভয় রাজনীতিতেই এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি। একদিকে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সম্পর্কের প্রত্যাশিত উষ্ণতা খুঁজে পাচ্ছেন না, অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে অভিবাসীদের ইতালিতে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নতুন করে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপের সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেলোনি তার এই সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।

ওয়াশিংটন-রোম অক্ষ এবং ট্রাম্প ফ্যাক্টর

জর্জিয়া মেলোনি ছিলেন ইউরোপের একমাত্র শীর্ষ নেতা, যিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ব্যক্তিগতভাবে ওয়াশিংটনে উড়ে গিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, ট্রাম্পের রক্ষণশীল নীতির সাথে মেলোনির আদর্শিক মিল থাকায় দুই দেশের সম্পর্ক এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতি সেই সমীকরণকে ওলটপালট করে দিয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আসা কিছু কঠোর মন্তব্য ও অবস্থানের প্রেক্ষিতে মেলোনি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “আমি ভেবেছিলাম তার সাথে কাজ করা অনেক বেশি সহজ হবে।” তবে সম্পর্কের এই শৈত্য প্রবাহ সত্ত্বেও মেলোনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থানের সাথে তার সরকারের এখনো অনেক নীতিগত মিল রয়েছে।

ইউরোপীয় অভিবাসন চুক্তি ও নেদারল্যান্ডসের পদক্ষেপ

ইতালির জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইউরোপীয় অভিবাসন চুক্তি বা ‘নিউ ইউরোপীয় মাইগ্রেশন প্যাক’। নেদারল্যান্ডস সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে, তারা নতুন এই চুক্তির আওতায় সেই সব আশ্রয়প্রার্থীদের ইতালিতে ফেরত পাঠাবে, যারা প্রথম ইতালীয় উপকূলে অবতরণ করেছিলেন। নেদারল্যান্ডস হলো ষষ্ঠ ইউরোপীয় দেশ যারা এই ‘ডাবলিন রেগুলেশন’ (Dublin Regulation) অনুযায়ী অভিবাসীদের ইতালিতে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিল।

ইতালির প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির (PD) নেত্রী এলি শ্লিন (Elly Schlein) সরকারের এই পরিস্থিতিকে একটি ‘বুমেরাং’ বা হিতে বিপরীত ফলাফল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শ্লিনের মতে, সরকার যে ইউরোপীয় চুক্তির পক্ষে সওয়াল করেছিল, এখন সেই চুক্তিই ইতালির ওপর অতিরিক্ত অভিবাসীর বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।

মেলোনির পাল্টা জবাব ও পরিসংখ্যান

বিরোধী দলের কঠোর সমালোচনার জবাবে প্রধানমন্ত্রী মেলোনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুর চড়িয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শেঞ্জেন (Schengen) ব্যবস্থা এবং অভিবাসন চুক্তি এক বিষয় নয়। তিনি বিরোধীদের ‘প্রোপাগান্ডা’ বন্ধ করার পরামর্শ দিয়ে জানান যে, তার সরকার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় আপসহীন। মেলোনি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ থেকে আসা প্রায় ৮০ হাজার অভিবাসী হস্তান্তরের অনুরোধ ইতালি সফলভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইতালীয় সরকারের সদর দপ্তর প্যালাজ্জো চিজি (Palazzo Chigi) থেকে জানানো হয়েছে, ‘নিরাপদ তৃতীয় দেশ’ (Safe Third Country) নীতি শক্তিশালী করার ফলে এখন অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত স্বদেশে ফেরত পাঠানো সহজতর হচ্ছে। এটি মূলত দ্রুত প্রত্যাবাসন বা ‘অ্যাক্সিলারেটেড রিটার্ন’ প্রক্রিয়ার অংশ।

সরকার ও জোটের অবস্থান

মেলোনির দল ‘ফ্রাতেলি দ’ইতালিয়া’ (Fratelli d’Italia) এবং জোট শরিক ‘ফোরজা ইতালিয়া’ (Forza Italia) একযোগে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকে সমর্থন করেছে। রিমিমি (Rimini) সম্মেলনে দেওয়া এক বক্তব্যে মন্ত্রী ফ্রান্সেসকো ললোব্রিজিডা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন সীমান্ত সুরক্ষায় ইতালির দেখানো পথেই হাঁটছে। তিনি অভিবাসীদের ‘আক্রমণ’ বা ইনভেশনের আশঙ্কাকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, বিরোধীরা অহেতুক আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ফোরজা ইতালিয়াও দাবি করেছে যে, ইতালির কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে নতুন এবং কার্যকর পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।

সব মিলিয়ে, ওয়াশিংটনের সাথে কূটনৈতিক শীতলতা এবং ব্রাসেলসের অভিবাসন নীতি—এই দুই ফ্রন্টে জর্জিয়া মেলোনিকে এখন ইতালির জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব প্রমাণের কঠিন পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং ইউরোপীয় শরিকদের সাথে অভিবাসন ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে রোমের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

ইউরোপের নতুন অভিবাসন চুক্তির পরও ইতালি নিজেকে সুরক্ষিত দাবি করছে, আর মেলোনি বলছেন—দেশটি ২০২৩ সাল থেকে হাজারো অন্য দেশের আশ্রয়-দাবির দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

rainews

Share This Article