ইউএনএইচসিআরের ‘ইউনিকোর’ প্রকল্পের আওতায় সোমালিয়া, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানের চার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন মাস্টার্স প্রোগ্রামে; বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশে আশ্রিত শরণার্থীদের জন্য ইতালিজুড়ে দেওয়া হচ্ছে ৭৮টি শিক্ষাবৃত্তি।
উদ্বাস্তু ও সংঘাতপীড়িত বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মেধাবী শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে ইতালির ঐতিহ্যবাহী ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয় (Università di Firenze)। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর (UNHCR)-এর সহায়তায় পরিচালিত মানবিক শিক্ষা করিডোর বা ‘ইউনিকোর’ (UNICORE) প্রকল্পের আওতায় চারজন শরণার্থী শিক্ষার্থীকে পূর্ণাঙ্গ বৃত্তিসহ মাস্টার্স কোর্সে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে ইতালির তোসকানা অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র ফ্লোরেন্সে এসে পৌঁছানো শিক্ষার্থীদের উষ্ণ প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পাওয়া চার শিক্ষার্থীর জাতীয়তা ও অধ্যয়নের বিষয় নির্ধারিত হয়েছে তাদের পূর্ববর্তী মেধার মূল্যায়নে। তাদের মধ্যে একজন সোমালিয়ার নাগরিক, যিনি ভর্তি হয়েছেন জিওইঞ্জিনিয়ারিং (Geoengineering) বিভাগে। দ্বিতীয়জন মধ্য আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর শিক্ষার্থী; তিনি স্নাতকোত্তর করবেন ফাইন্যান্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে। বাকি দুজন শিক্ষার্থী সংঘাতবিধ্বস্ত দক্ষিণ সুদানের নাগরিক। তাদের একজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ হিসেবে ভূগোল, আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ে ইতোমধ্যে পড়াশোনা শুরু করতে ফ্লোরেন্সে উপস্থিত হয়েছেন। একই দেশ থেকে মনোনীত অন্য শিক্ষার্থী অর্থনীতি ও উন্নয়ন (Economics and development) বিষয়ে পড়ার কথা রয়েছে এবং তিনি শিগগিরই ইতালিতে পৌঁছাবেন। নির্বাচিত চার শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ ইংরেজি মাধ্যমে তাদের উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করবেন।

ক্যাম্পাসে ইতোমধ্যে উপস্থিত হওয়া তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গে সম্প্রতি এক সৌজন্য বৈঠকে মিলিত হন ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর আলেসান্দ্রা পেত্রুচ্চি। শিক্ষার্থীদের বরণ করে নিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, সমাজে বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয় সর্বদা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ইউনিকোর প্রকল্পে অংশগ্রহণ সেই প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনেরই অংশ। রেক্টর আরও বলেন, প্রতিকূল পরিবেশ থেকে আসা এই মেধাবী তরুণরা যাতে একটি নিরাপদ, সহমর্মিতাপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক আবহে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয় সেই পরিবেশ নিশ্চিত করবে। একই সাথে শিক্ষার মৌলিক অধিকার রক্ষায় এ ধরনের প্রকল্পের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন তিনি।
উদ্বাস্তু শিক্ষার্থীদের পুনর্বাসন ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে ইউনিকোর কর্মসূচিটি বর্তমানে তার অষ্টম সংস্করণে প্রবেশ করেছে। চলতি বছর ইতালির মোট ৪১টি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে সম্মিলিতভাবে ৭৮টি শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছে। এই বৃত্তির মূল শর্ত হলো, নিজ দেশ ছেড়ে অন্য কোনো তৃতীয় দেশে সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া নিবন্ধিত শরণার্থীরাই কেবল এতে আবেদনের সুযোগ পান। যেসব দেশ থেকে শরণার্থীরা এ বছর আবেদনের যোগ্য হয়েছেন তার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, কেনিয়া, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া, উগান্ডা, ক্যামেরুন, মোজাম্বিক, নাইজার, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে এবং বুরকিনা ফাসো। ফলে বাংলাদেশে বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রিত তরুণ প্রজন্মের জন্যও এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মেধা বিকাশের একটি অন্যতম ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই সামগ্রিক উদ্যোগ বাস্তবায়নে ইতালির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংস্থা যৌথভাবে অংশীদারিত্ব করছে। জাতীয় পর্যায়ে এই কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত রয়েছে ইতালির পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্ত্রণালয় (MAECI), কারিতাস ইতালিয়ানা (Caritas Italiana), দিয়াকোনিয়া ভালদেসে (Diaconia Valdese), সেন্ট্রো আস্তাল্লি (Centro Astalli), ফনদাজিওনে ফিনানজা এতিকা এবং গান্ধী চ্যারিটি। স্থানীয় পর্যায়ে ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়কে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করছে দিয়াকোনিয়া ভালদেসে-সিএসডি এবং জর্জো লা পিরা আন্তর্জাতিক ছাত্র কেন্দ্র। যুদ্ধ, অনিশ্চয়তা ও বাস্তুচ্যুতির শিকার শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ উপায়ে শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই মানবিক করিডোর বিশ্বজুড়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ‘ইউনিকোর’ প্রকল্পের আওতায় ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে চার শরণার্থী শিক্ষার্থী পাচ্ছেন ইতালিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ, সঙ্গে বৃত্তি ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ।
firenze.repubblica


