শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থী কোটার বিরোধিতা প্রাথো সিটি কাউন্সিলের: মেলোনি সরকারের স্কুল ডিক্রি প্রত্যাহারের দাবি

4 Min Read

প্রথম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী নির্ধারণকে বাস্তবতাবিবর্জিত ও বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে প্রস্তাব পাস; নাগরিকত্বের বদলে ভাষাগত দক্ষতাকে মূল্যায়নের জোর আহ্বান।

ইতালির সরকারি বিদ্যালয়গুলোর প্রথম শ্রেণিতে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বিদেশি শিক্ষার্থী নির্ধারণসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বিতর্কিত বিধিমালার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানিয়েছে তুসকানি অঞ্চলের প্রাথো সিটি কাউন্সিল। কট্টর ডানপন্থী জর্জিয়া মেলোনি সরকারের ঘোষিত এই ‘স্কুল ডিক্রি’ (Decreto Scuola)-এর বিপক্ষে প্রাথোর স্থানীয় আইনসভায় একটি সমন্বিত প্রস্তাব (Ordine del Giorno) পাস হয়েছে। আইনসভায় প্রস্তাবটির পক্ষে ১৭ জন কাউন্সিলর ভোট দেন এবং বিরোধীদের ৭ জন সদস্য এর বিপক্ষে অবস্থান নেন। ডেমোক্রেটিক পার্টি (PD), বিফোনি সিন্দাকো, অর্গলিয়ো পের প্রাথো এবং গ্রিন-লেফট অ্যালায়েন্সের যৌথ উদ্যোগে উত্থাপিত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে শহরের মেয়র ও নির্বাহী পরিষদকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় পৌরসভা অ্যাসোসিয়েশন আনচিতে (ANCI) শহরের তীব্র অসম্মতি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

আইনসভায় প্রস্তাবটি উত্থাপনকারী ডেমোক্রেটিক পার্টির কাউন্সিলর আরিয়ানা সালিমুসায় বলেন, শিক্ষাঙ্গনে নির্দিষ্ট শতকরা হারের এমন কৃত্রিম ও অনমনীয় সীমা চাপিয়ে দেওয়া ইতালির প্রকৃত সামাজিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করার শামিল। বিশেষ করে প্রাথোর মতো একটি বহুসাংস্কৃতিক শহরে, যেখানে বিশ্বের প্রায় ১২০টি ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ যুগ যুগ ধরে সম্প্রীতির সাথে একসঙ্গে বসবাস ও পড়াশোনা করছে, সেখানে কোটাভিত্তিক নীতি বাস্তবায়ন করা অসম্ভব। তিনি সুস্পষ্ট যুক্তি তুলে ধরে বলেন, নাগরিকত্ব আর ভাষার দক্ষতা কখনোই এক নয়। প্রাথোতে জন্ম নেওয়া একটি শিশু বিশুদ্ধ ইতালিয়ান ভাষা জানা সত্ত্বেও কেবল দুই বছর নার্সারি স্কুলে (Asilo) না যাওয়ার কারণে কোটার অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ছে; অথচ ইতালির নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও যেসব শিশুর বাস্তবিক অর্থেই ভাষাগত সহায়তা প্রয়োজন, সরকারি এই ডিক্রিতে তাদের শনাক্ত করার কোনো উপায় রাখা হয়নি। ফলে নাগরিকত্বকে মানদণ্ড না বানিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত ভাষাগত যোগ্যতাকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

সিটি কাউন্সিলের প্রস্তাবে প্রাথো শহরের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত সফল অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘প্রাথো মডেল’ (Modello Prato)-এর কথা উল্লেখ করা হয়। এই উদ্যোগকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে নাগরিকত্বের বদলে ভাষাগত যোগ্যতার জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের সহায়তায় বিশেষায়িত ‘ইতালিয়ান এল-টু’ (Italiano L2) বিষয়ক অতিরিক্ত এ০২৩ (A023) শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে অভিবাসী অভিভাবকদের জন্য ভাষা শিক্ষা কেন্দ্র চিপিয়াতে (CPIA) কর্মঘণ্টার সাথে সংগতি রেখে পর্যাপ্ত শিক্ষক, আসন ও সান্ধ্যকালীন ক্লাসের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়, যাতে অভিবাসী পরিবারের ওপর কোনো অন্যায় শাস্তিমূলক নীতি চাপিয়ে দেওয়া না হয়।

বিতর্কে অংশ নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির দলনেতা মার্কো সাপিয়া বলেন, সরকারি বিদ্যালয়ের মূল ভিত্তি হলো বহু সংস্কৃতির শিশুদের একই বেঞ্চে বসিয়ে পারস্পরিক বৈচিত্র্যকে শক্তিতে রূপান্তর করা, সংস্কৃতিকে আলাদা করা নয়। তিনি ১৯৭০ সালের তুরিন শহরের উদাহরণ দিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন, সেই সময় দক্ষিণাঞ্চলীয় অভিবাসী শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় বিভাজন না এনে বরং ১৯৭১ সালের ৮২০ নম্বর আইনের মাধ্যমে পূর্ণদিবস স্কুল ব্যবস্থা (Tempo Pieno) চালু করা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের উচিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বৃদ্ধি করা, শিক্ষাঙ্গনে বিভাজনের মাধ্যমে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরানো নয়।

উল্লেখ্য, ইতালির অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী প্রাথোতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। কেন্দ্রীয় সরকারের এই কোটানীতি বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় বহু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিশুর পছন্দের পাবলিক স্কুলে ভর্তি প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রাথো নগর পরিষদের এমন জোরালো অবস্থান স্থানীয় অভিবাসী অভিভাবকদের মাঝে স্বস্তি তৈরি করেছে।

প্রাথোর কাউন্সিল ৩০% বিদেশি শিক্ষার্থী কোটা বাতিলের দাবি জানিয়ে প্রস্তাব পাস করেছে; ভাষাগত দক্ষতাকে শিক্ষার্থী মূল্যায়নের মূল ভিত্তি করার আহ্বান।

tvprato

Share This Article