ইতালিতে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু: তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে না জানানোর রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু

4 Min Read

সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানোতে কৃষি প্রতিষ্ঠানে ফর্কলিফটের ধাক্কায় উঁচু থেকে পড়ে গিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারালেন ২৮ বছর বয়সী অভিবাসী; ময়নাতদন্তের নির্দেশ প্রসিকিউশনের।

ইতালির দক্ষিণাঞ্চলীয় কাম্পানিয়া অঞ্চলের নাপোলি প্রদেশের সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানো এলাকায় কর্মক্ষেত্রে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক বাংলাদেশি যুবকের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় একটি কৃষি কনসোর্টিয়ামে নিয়মিত কর্মী হিসেবে কর্মরত অবস্থায় তিনি এই দুর্ঘটনার শিকার হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে নাপোলির ‘ওসপেদালে দেল মারে’ হাসপাতালে ভর্তি করার কয়েক দিন পর চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যুবকের মৃত্যুর পরই মূলত পুরো ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে এবং পুলিশি হস্তক্ষেপ শুরু হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নিহত বাংলাদেশি যুবকের জন্ম ১৯৯৬ সালে, অর্থাৎ তাঁর বয়স হয়েছিল আনুমানিক ২৮ বছর। তিনি সান জেন্নারোর ‘ক্রাফ’ (CRAF) পরিচালিত একটি অভিবাসী অভ্যর্থনা কেন্দ্রে নিয়মিতভাবে বসবাস করে আসছিলেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ১২ অক্টোবর সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানোর একটি কৃষি খামারে দায়িত্ব পালনকালে তিনি মারাত্মক দুর্ঘটনার শিকার হন। কাজ করার সময় একটি চলন্ত ফর্কলিফট বা মালামাল ওঠানামার যান্ত্রিক যানের ধাক্কায় তিনি অনেকটা ওপর থেকে নিচে ছিটকে পড়েন। এতে তিনি মাথায় ও শরীরে অত্যন্ত গুরুতর আঘাত পান।

এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনে সবচেয়ে সন্দেহজনক ও চাঞ্চল্যকর দিক হলো—দুর্ঘটনা ঘটার পর দীর্ঘ সময়েও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সংস্থাকেই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। গত ১২ অক্টোবর কর্মক্ষেত্রে এমন মারাত্মক রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটলেও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্টরা তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশে খবর না দিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় ওই শ্রমিককে হাসপাতালে স্থানান্তর করে। পরবর্তীতে হাসপাতালে যুবকের মৃত্যুর পর সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরাই প্রথম সান জেন্নারো ভেসুভিয়ানো স্টেশনের কারাবিনিয়ারি (Carabinieri) বাহিনীকে অবহিত করেন। খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ সদস্যরা হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন এবং তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে স্থানীয় পাবলিক প্রসিকিউটর কার্যালয় থেকে তাৎক্ষণিক ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের নির্দেশে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের (Autopsy) জন্য পুলিশি হেফাজতে জব্দ করা হয়েছে। একই সাথে যে ফর্কলিফটটির ধাক্কায় এই দুর্ঘটনা ঘটেছে, সেটির কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা অপব্যবহার হয়েছিল কি না তা নিশ্চিত করতে সেটিও ক্রোক বা জব্দ করা হয়েছে।

শ্রমিকের এই মৃত্যুর ঘটনায় যৌথভাবে ব্যাপক তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় থানা পুলিশ, কারাবিনিয়ারির বিশেষ শ্রম পরিদর্শন শাখা এনআইএল (NIL) এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও প্রতিরোধ বিভাগ (ASL)। তদন্তকারী কর্মকর্তারা খতিয়ে দেখছেন, সংশ্লিষ্ট কৃষি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় শ্রমিকের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ছিল কি না, ফর্কলিফট চালকের যথাযথ ছাড়পত্র ছিল কি না এবং কেন এই দুর্ঘটনার খবর সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও জরুরি সংস্থাকে না জানিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তদন্তে নিরাপত্তা বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করা নিয়ে বারবার দাবি উঠে আসছে। সান জেন্নারোতে তরুণ এই বাংলাদেশির আকস্মিক প্রয়াণে স্থানীয় অভিবাসী কমিউনিটির মাঝে গভীর শোক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। আইনি ও ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ দেশে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে।

কাজের সময় চলন্ত ফর্কলিফটের ধাক্কায় উঁচু থেকে পড়ে গুরুতর আহত বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু; দুর্ঘটনার ঘটনায় ফর্কলিফট জব্দ করে তদন্তে নেমেছে কারাবিনিয়েরি, NIL ও ASL।

napolivillage

Share This Article