বিদেশে জীবিকার সন্ধানে যাওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে; চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই দেশে এসেছে চার হাজারের বেশি নিথর দেহ। একদিকে প্রতিকূল কর্মপরিবেশ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি, অন্যদিকে মরদেহ প্রত্যাবাসনে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় চরম দুর্ভোগে পড়ছেন স্বজনরা।
উন্নত ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের মৃত্যুর মিছিল দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ হাজার ৬০ জন প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে এসেছে। সরকারি এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের বেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধার মরদেহ কফিনে বন্দি হয়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শীর্ষ কর্মসংস্থান দেশ সৌদি আরবে, যেখানে বিগত নয় মাসে মারা গেছেন প্রায় দুই হাজার কর্মী। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে মালয়েশিয়ায়, যদিও দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে নতুন কর্মী নিয়োগ বন্ধ রয়েছে।
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহামারি করোনার সময় স্থানীয়ভাবে দাফন করায় ২০২০ সালে মরদেহ আসার সংখ্যা কমে ৩ হাজার ১৪০-এ দাঁড়িয়েছিল। তবে ২০২১ সাল থেকে এই সংখ্যা পুনরায় বাড়তে থাকে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে ১৮ হাজার ১৬৬ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছিল, যার মধ্যে অন্তত ২০ শতাংশ মৃত্যুই ছিল কর্মক্ষেত্র ও যাতায়াতকালীন নানা দুর্ঘটনাজনিত। শুধু সড়ক দুর্ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছিলেন ২ হাজার ৬৪৯ জন। চলতি বছরও সড়ক দুর্ঘটনা, কাজের স্থানে পতন, অগ্নিকাণ্ড ও বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ১৬ শতাংশের বেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে আসা মরদেহের নথিপত্রে সিংহভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ উল্লেখ করা হচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে আসা নথির ৬৬ শতাংশেই স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামো নির্মাণ খাতে তীব্র তাপপ্রবাহে একটানা কাজ, পানিশূন্যতা এবং মানসিক চাপের কারণে কিডনি বিকল ও হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী যুবকদেরও অকালমৃত্যু ঘটছে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন ও আত্মহত্যার ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট দেশের দেওয়া সনদের বাইরে বাংলাদেশ থেকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বিএমইটির তিন দিনের সংক্ষিপ্ত ও অপর্যাপ্ত প্রাক-বহির্গমন প্রশিক্ষণও কর্মীদের প্রতিকূল পরিবেশের ঝুঁকি মোকাবিলায় কাজে আসছে না।

এদিকে বৈধ কাগজপত্র থাকা নিয়মিত কর্মীদের মরদেহ দ্রুত এলেও অনিয়মিত বা নথিপত্রহীন কর্মীদের মরদেহ দেশে আনতে স্বজনদের চরম হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন নেই, সেখানে জটিলতা বহুগুণ বাড়ে। কম্বোডিয়ায় দুর্ঘটনায় নিহত পাবনার আল আমিনের মরদেহ দেশে আনতে কূটনৈতিক জটিলতায় প্রায় দেড় বছর সময় লেগে যায়, যেখানে স্থানীয় প্রবাসীদের ব্যক্তিগত সহায়তায় মরদেহ শনাক্ত করতে হয়েছিল।
নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ বা নিবন্ধিত কর্মীদের মরদেহ পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরে দাফন সহায়তা বাবদ নগদ ৩৫ হাজার টাকা এবং পরবর্তীতে পরিবারকে ৩ লাখ টাকার অনুদান দেওয়া হয়। পাশাপাশি জীবনবিমা ও বকেয়া বেতন-ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করে দূতাবাস। কল্যাণ বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দাফন বাবদ ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, অনুদান হিসেবে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং বিমা বাবদ ৪৪ কোটি টাকার বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিপূরণ ও বকেয়া বাবদ দূতাবাসগুলো প্রায় ৭৫ কোটি টাকা আদায় করেছে। তবে এই অর্থ পেতে দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় ঘুরে ঘুরে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান জানান, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৭০ শতাংশের বেশি মরদেহ আসছে। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখা, বিদেশে নারী কর্মীদের আত্মহত্যার বিষয়টি তদন্ত করা এবং অনিয়মিত হলেও রাষ্ট্রীয় খরচে মরদেহ দ্রুত আনার দায়িত্ব নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং অনিয়মিতদের মরদেহ দ্রুত ফেরত আনতে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত শ্রমিকদের মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনা করছে সরকার।
এ বছরের প্রথম ৯ মাসে বিদেশ থেকে ৪,০৬০ প্রবাসী শ্রমিকের মরদেহ দেশে ফিরেছে; প্রতিদিন গড়ে ১৪টির বেশি। সবচেয়ে বেশি মৃত্যু সৌদি আরবে, আর দুর্ঘটনাই প্রধান কারণগুলোর একটি।
prothomalo


