তুরিনে বৃহৎ মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের অনুমোদন দিল পুরসভা: ক্ষুব্ধ ডানপন্থীদের আইনি লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি

4 Min Read

সাবেক ঐতিহাসিক কারখানায় ১৭ মিলিয়ন ইউরো ব্যয়ে এক হাজার মুসল্লির প্রার্থনাকক্ষ ও শিক্ষার্থীদের আবাসন নির্মাণের অনুমতি মিললেও আঞ্চলিক সরকারের বিরোধিতায় দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক সংঘাত।

দীর্ঘ পাঁচ বছরের জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষে ইতালির তুরিন শহরে একটি বৃহৎ ইসলামিক কেন্দ্র ও মসজিদ নির্মাণের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছে স্থানীয় পুরসভা। ঘোষিত এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নগরীর ভিয়া বোলোনিয়া ও করসো নোভারার সংযোগস্থলে অবস্থিত বিশ শতকের ঐতিহাসিক ‘নেবিওলো’ ঢালাই কারখানার (ex Fonderia Nebiolo) পরিত্যক্ত ভবন পুনর্নির্মাণের বৈধ ছাড়পত্র দেওয়া হলো। ইতালীয় ইসলামিক কনফেডারেশন জানিয়েছে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের নির্মাণকাজ শুরু করার লক্ষ্যে তারা চূড়ান্ত কারিগরি নকশা প্রস্তুত করছে।

প্রায় ছয় হাজার বর্গমিটার এলাকা জুড়ে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং একটি সমন্বিত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা। ১৭ মিলিয়ন ইউরো (প্রায় ২২৫ কোটি টাকা) বাজেটের এই কমপ্লেক্সে এক হাজার মুসল্লির ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি প্রধান প্রার্থনাকক্ষ এবং প্রায় ২০ মিটার উঁচু একটি মিনার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে পরিকল্পনাকারীদের মতে, প্রকল্পের প্রায় ৮০ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ থাকবে অ-ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে। এর মধ্যে স্থানীয় সংস্থা এডিসুর (Edisu) সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী হোস্টেল, একটি গণগ্রন্থাগার এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তৈরি করা হবে।

যে স্থানটিতে এই ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মিত হতে যাচ্ছে, তা মূলত বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে মুদ্রণযন্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য বিখ্যাত নেবিওলো ঢালাই কারখানা ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটি আশির দশকে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। যেহেতু কারখানা ভবনটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে তালিকাভুক্ত, তাই সরকারের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (Soprintendenza) ছাড়পত্র নিয়ে এর মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখেই আধুনিকায়ন করা হবে। প্রকল্পটির ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মরক্কোর বাদশাহ ও দেশটির ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অনুদান হিসেবে দেওয়া হচ্ছে।

তবে পুরসভার এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা শুরু করেছে ডানপন্থী রাজনৈতিক মহল। পিডমন্ট অঞ্চলের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও আঞ্চলিক মন্ত্রী মাউরিৎসিও মাররোন মেয়র স্তেফানো লো রুসোর কড়া সমালোচনা করে দাবি করেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্থানীয় এলাকাগুলোকে অভিবাসী ছিটমহলের মতো রূপ দেওয়া হচ্ছে। শহরটির ‘ইসলামীকরণ’ ঠেকানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি জানান, ১৯৮৯ সালের আঞ্চলিক উপাসনালয় আইন সংশোধন করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ন্যূনতম বাধ্যতামূলক দূরত্বের বিধান চালু করা হবে। অন্য ধর্মের উপাসনালয়ের কাছাকাছি বিদেশি অর্থায়নে এমন স্থাপনা নির্মাণ ঠেকাতে এই আইনি পরিবর্তন আনা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

এদিকে প্রকল্পটি বন্ধ করতে আইনি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের ডাক দিয়েছে রাজনৈতিক দল ‘ফুতুরো নাৎসিয়োনালে’। দলটির নেতা এনরিকো ফোরজেসে জানান, অর্থায়নের উৎস, অ্যান্টি-মানিলন্ডারিং ও অ্যান্টি-মাফিয়া বিধিমালার কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, তা যাচাইয়ে তারা তুরিনের প্রিফেকচারে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করছেন। পাশাপাশি স্বরাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে সংসদীয় তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা। এর আগে প্রকল্পটি রুখতে তাদের আনা গণ-উদ্যোগ পুরসভা খারিজ করায় তারা বিষয়টি প্রশাসনিক আদালতে (TAR) তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আসন্ন দিনগুলোতে স্থানীয় নগর পরিষদেও এ নিয়ে উত্তপ্ত জবাবদিহিতার সূচি রয়েছে। একদিকে বিরোধী শিবিরের জোরদার বাধা ও আইনি জটিলতা, অন্যদিকে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় ও অভিবাসী শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে তুরিনের এই বহুল আলোচিত মেগা প্রকল্পটিকে ঘিরে ইতালির রাজনীতি এখন সরগরম।


তুরিনের সাবেক নেবিওলো ফাউন্ড্রিতে নতুন মসজিদ ও ইসলামিক কেন্দ্র নির্মাণে অনুমতি মিলেছে; হাজার মুসল্লির নামাজের স্থান, ছাত্রাবাস ও সাংস্কৃতিক পরিসর থাকলেও রাজনৈতিক আপত্তি ও আইনি উদ্যোগ চলছে।

torino.corriere

Share This Article