মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নেওয়ায় মিলানে পাঁচশত প্যারাট্রুপার মোতায়েন করেছে মেলোনি সরকার; অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অভিবাসী তরুণদের দমনে আসছে কঠোর আইন।
জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে শুরু হওয়া আন্দোলন হঠাৎ ব্যাপক সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে রূপ নেওয়ায় নজিরবিহীন অস্থিতিশীলতার মুখে পড়েছে ইতালির বাণিজ্যিক রাজধানী মিলান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শহরটিতে সামরিক বাহিনীর অভিজাত ‘ফোলগোরে’ (Folgore) ব্রিগেডের পাঁচ শতাধিক বিশেষ প্যারাট্রুপার নামানো হয়েছে। ইতালির ডানপন্থি প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির প্রশাসন জানিয়েছে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র কঠোর অবস্থান গ্রহণ করবে। মিলানের পাশাপাশি রোম, তুরিন, বেরগামো ও বোলোনিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতেও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে।
মিলানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ক্যাথেড্রাল সংলগ্ন এলাকায় প্রথমে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ সমাবেশ শুরু হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই তা সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। হুডি ও মুখোশ পরা একদল উচ্ছৃঙ্খল তরুণ বিভিন্ন স্থানে ময়লার কনটেইনারে আগুন দেয়, ভবনের কাচ ভাঙচুর করে এবং বেশ কিছু দোকানে লুটপাট চালায়। বিশেষ করে ডেক্যাথলন ও আর্কটেরিক্সের মতো বড় ক্রীড়াসামগ্রীর দোকান এবং মোবাইল অপারেটর ভোডাফোনের বিক্রয়কেন্দ্রে ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে পুনরায় হামলার আশঙ্কায় শহরের বিখ্যাত ফ্যাশন ডিস্ট্রিক্টের শ্যানেল, টিফানি ও ডিওরের মতো বিশ্বখ্যাত শোরুমগুলোর কাচের দেয়াল কাঠের তক্তা দিয়ে সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলা হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ ও প্যারাট্রুপার মিলিয়ে প্রায় এক হাজার চারশত নিরাপত্তা সদস্যকে মিলানে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।

সহিংসতায় জড়িত থাকার দায়ে মিলানে ইতোমধ্যে ২৭১ জন তরুণকে আটক করেছে পুলিশ, যাদের মধ্যে ৩২ জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক। এছাড়া আরও ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতে মামলা পাঠানো হয়েছে। এই অস্থিরতার পর দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী কিশোরদের সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র (যা স্থানীয়ভাবে ‘মারানজা’ নামে পরিচিত) এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে নতুন কঠোর আইনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, বিক্ষোভে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়াকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং সন্তানদের ভাঙচুর ও লুটপাটের জন্য অভিভাবকদের ওপর বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতিপূরণের দায় চাপানোর বিধান আনা হচ্ছে।
এদিকে সরকারের কঠোর পদক্ষেপের পাল্টা জবাব হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘১৭ অক্টোবর’ নামে একটি নতুন যুব প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। বর্তমান সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত প্রতি শনিবার মিলানসহ বড় শহরগুলোতে লাগাতার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে তারা। তবে বিরোধী দলগুলো সরকারের নীতির সমালোচনা করে অভিযোগ করেছে, সুবিধাবঞ্চিত এলাকার আবাসন সংকট, শিক্ষা এবং নিম্ন জীবনযাত্রার মতো মূল সংকটগুলো সমাধান না করে মেলোনি প্রশাসন কেবল নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে এনে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার জেরে ছড়িয়ে পড়া এই বিক্ষোভ কেবল ইতালিতেই সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিবেশী ফ্রান্সেও নজিরবিহীন দাঙ্গা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আড়াই সহস্রাধিক মানুষকে গ্রেফতারের পাশাপাশি সামরিক বাহিনী নামানো হয়েছে। এছাড়া আবাসন সংকটের প্রতিবাদে পর্তুগালের লিসবন ও স্পেনের মাদ্রিদেও হাজার হাজার নাগরিক রাজপথে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে পুরো ইউরোপজুড়েই এখন নাগরিক অসন্তোষ ও সামাজিক অস্থিরতা তীব্র রূপ ধারণ করেছে।
মিলানে নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কায় ১,৪০০ পুলিশ ও ফোলগোরে প্যারাট্রুপার মোতায়েন, মিছিল নিষিদ্ধ এবং দোকানের সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে; সরকার সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
Tgr


